মায়ের আশা পূরণ হলো না

দুর্বৃত্তের ছোড়া ইটের আঘাতে গভীর কোমায় চলে যান সাজিদ চৌধুরী রাফি (২১)। নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শরীরে জীবন থাকলেও সাড়া ছিল না কোনো। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, চারপাশে যন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন টু-টু শব্দ। আর বাইরে প্রতিদিন একই জায়গায় বসে মায়ের আশা। প্রতিটি টু-টু শব্দ তার কাছে ছিল নতুন আশার আলো। মায়ের সেই অপেক্ষা আর পূরণ হলো না; আইসিইউর বিছানা থেকেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন একমাত্র সন্তান। তাকে আর ফেরত পেলেন না মা। ছেলের শোকে পাগলপ্রায় মায়ের কান্না থামছেই না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সোমবার সকাল ৭টার দিকে মারা যান সাজিদ। এর আগে গত ৯ জুন পূর্ব শেওড়াপাড়ায় চলন্ত মোটরসাইকেলে থাকা সাজিদকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তের ছোড়া ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটে পড়েন। দুর্বৃত্তরাই তাকে রিকশাযোগে হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার পরপরই কোমায় চলে যান সাজিদ। ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান তিনি।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সাজিদের নাকের ওপরের অংশের কপালে ও মাথায় আঘাত লাগে। মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তিনি কোমায় চলে যান। শুরু থেকেই তাকে লাইফ সাপোর্টে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাজিদ কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মিরপুরে পড়ালেখা করতেন। তার বাবার নাম শামসুল চৌধুরী। মা তানিয়া সিকদার। সাজিদ বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, বাসায় থাকেন। মা দুবাই প্রবাসী। সেখানে ফ্ল্যাটের ব্যবসা রয়েছে তাদের। সাজিদ পড়ালেখার পাশাপাশি কাফরুলে নিজস্ব বাড়ি দেখাশোনা করতেন। তার মা ঈদের ছুটিতে দেশে আসেন। সাজিদকে ইট মেরে আহত করার দুই দিন পরই তার দুবাই ফ্লাইট ছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলের জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দেশ ছাড়েননি মা। সারাক্ষণ কাচঘেরা আইসিইউর ভেতরে স্থির তাকিয়ে থাকতেন কোমা থেকে ছেলে একটু নড়ে উঠবে, সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরে আসবে, সেই অপেক্ষায়। কিন্তু ছেলের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মায়ের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে।

গতকাল দুপুরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গের সামনে আর্তনাদ করতে দেখা যায় মা তানিয়া সিকদারকে। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলেকে মেরে ফেলা অপরাধীরা যেন রেহাই না পায়। তারা যেন অবশ্যই শাস্তি পায়। আপনারা তদন্ত করে দেখেন, এর মূল হোতা কে। ওরা যেন জামিন না পায়। ওরা জামিন পেলে কাল আরেক মায়ের বুক খালি করে ফেলবে। আমার ছেলেকে তো আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। আমার বুক খালি করে ফেলছে। আমি শুধু বিচার চাই।’

সাজিদ চৌধুরী রাফির ফুপু সানজিদা আক্তার ইতি বলেন, ‘ওরা (ঘাতকরা) এলাকার বখাটে। ওদের নামে ১০-২০টা মামলা আছে। মাদক বিক্রি করে, ছিনতাই করে। ঘটনার আগের দিন দুপুরে রাফি ওদেরকে আমাদের বাসায় ঢুকতে নিষেধ করেছিল। বলেছিল, তোরা নেশা করিস, আমাদের বাসায় ঢুকবি না। ওরাই রাফিকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়ে মারে।’ তিনি বলেন, ‘যেই ছেলে ইট মেরেছে, সে আগে রাফিদের বাসায় ভাড়া থাকত। ওইখানে মাদক বিক্রি করত। তখন রাফি পুলিশ দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলে আর যোগাযোগ ছিল না। তারাই ঘটনাটি ঘটিয়েছে।’ তবে চাচাদের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধেও অভিযুক্তদের দিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা তার।

দুপুরের পরপরই সাজিদের মরদেহ নেওয়া হয় কাফরুলের বাসায়। সেখানে এলাকাবাসীর ঢল নামে। সাজিদের মরদেহ দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন মানুষ। এ সময় সহপাঠী, এলাকাবাসী ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

সাজিদকে ইট ছুড়ে মারার ঘটনায় ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পূর্ব শেওড়াপাড়ার আশরাফ আলী গলি দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে সাজিদ যাচ্ছিলেন। এক তরুণ সাজিদকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়ে মারে। ইটের আঘাতে তিনি মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়ে অচেতন হয়ে যান। এ সময় মোটরসাইকেলটি তার শরীরের ওপর পড়ে থাকে। পরে দুর্বৃত্তরাই রিকশায় করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তখন হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কাফরুল থানায় মামলা করেন সাজিদের চাচা নুর হোসেন। মামলার চার আসামির মধ্যে পারভেজ, আনোয়ার হোসেন বাবু ও মো. ফয়সাল ওরফে কালু নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। আমিন নামের এক আসামি এখনো পলাতক।

কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন জানান, অভিযুক্তরা এক সময় নিহত সাজিদদের বাসায় ভাড়া থাকত। সেখানে মাদক ব্যবসা করত। সাজিদ এসবে বাধা দেওয়ায় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সাজিদকে তারা ইট ছুড়ে মারে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় বেশ কয়েকটি মাদক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। আর পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।

নানা সম্পর্কে সাজিদের এক আত্মীয় জানান, দুপুরের পরপর কাফরুলে বাসার সামনে সাজিদের প্রথম জানাজা হয়েছে। এরপর তার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠিতে রওনা দিয়েছেন তার মাসহ স্বজনরা। সেখানেই সাজিদকে দাফন হয়। সেখানেও ভিড় করেন এলাকাবাসী। তারাও সাজিদ হত্যায় জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানান।