ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে ৪১ বছর বয়সী এক মহাতারকার জন্য সময়টা যেন বড্ড নিষ্ঠুর। আন্তর্জাতিক ফুটবলের একাধিক রেকর্ড যার দখলে, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কি নানিজের শেষ বিশ্বকাপে এক চরম অস্তিত্ব সংকটে। কঙ্গোর বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ১-১ ড্রয়ের পর পর্তুগাল শিবিরের আকাশে এখন কেবলই হতাশার মেঘ। সেই ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থেকে স্রেফ ২৫ বার বল ছুঁতে পেরেছেন রোনালদো, যা বিশ্বকাপে তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। কোনো শট অন টার্গেট নেই, নেই চেনা সেই গতি। থিয়েরি অঁরির মতো কিংবদন্তিরা তো সরাসরি খোঁচা দিয়েই বলছেন, ‘দলকে গোল করতে হবে, আপনাকে নয়।’ সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন কোচ রবার্তো মার্তিনেজকে ধুয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘মার্তিনেজ রোনালদোকে মাঠ থেকে তোলার সাহস পান না।’ এমন এক নাজেহাল পারফরম্যান্স আর তীব্র সমালোচনার কাঁটা গায়ে মেখেই হিউস্টনের মাঠে উজবেকিস্তানের মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সামনে যখন শক্তিশালী কলম্বিয়া, তখন এই ম্যাচটি পর্তুগালের জন্য নিজেদের ফেরানোর লড়াই, আর রোনালদোর জন্য তার শেষ গৌরব রক্ষার অগ্নিপরীক্ষা।
রোনালদোকে ঘিরে দলের ভেতর কোনো অদৃশ্য চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে চারপাশের গুঞ্জন এখন তুঙ্গে। সংবাদ সম্মেলনে তরুণ উইঙ্গার ফ্রান্সিসকো কনসেসাওকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল দল কি তবে মাঠে সব বল কেবল রোনালদোকেই পাস দিতে বাধ্য হয়? জবাবে ২৩ বছর বয়সী এই জুভেন্টাস তারকা কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, ‘মাঠে তাকেই বল পাস দিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োজন আমাদের নেই। উদাহরণস্বরূপ, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকেই পাস দিই, যাকে ওই মুহূর্তে সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে দেখি। আমার পাশে থাকা সতীর্থের মুখটা কার, তা ভাবার মতো সময় মাঠে থাকে না; সবকিছু সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই ঘটে যায়।’
তবে অধিনায়কের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা জানিয়ে কনসেসাও যোগ করেন, ‘৪১ বছর বয়সেও ক্রিশ্চিয়ানো তার ক্যারিয়ার এবং এখনো গোল করার যে ক্ষুধা ধরে রেখেছেন, তার জন্য তিনি এক অনন্য উদাহরণ... তিনি আমাদের নেতৃত্ব ও গোলস্কোরিংয়ের প্রতীক। যখন গোল করার প্রসঙ্গ আসে, তখন তার মতো কেউ নেই। তবে অন্য সব খেলোয়াড়ের মতো তিনিও এখানে দলকে সাহায্য করতেই এসেছেন।’
এদিকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পর্তুগালের এই মহাবিপদের সময়ে প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানের জন্য এই ম্যাচটি এক পরাবাস্তব আবেগের কোলাজ। মধ্য এশিয়ার এই দেশটির প্রাচীন মাদ্রাসা আর ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে বছরের পর বছর ধরে রোনালদো এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম; যেখানে মেসি-রোনালদোর জার্সি বিক্রি করেই বড় হয় এক একটি প্রজন্ম।
উজবেকিস্তানের খিভারের ২২ বছর বয়সী এক তরুণ নুরাদ্দিন বলতাবোয়েভ, যিনি একটি পর্যটন অ্যাপার্টমেন্ট (ট্যুরিস্ট অ্যাপার্টমেন্ট) পরিচালনা করেন, তিনি ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন, রোনালদোর কারণেই তিনি আগের বিশ্বকাপগুলোতে পর্তুগালকে সমর্থন করতেন, ‘তিনি আমাদের এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। প্রতিটি শিশু, প্রতিটি তরুণ তার মতোই হতে চায়।’ তবে এবার নিজের দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ায় আবেগে আপ্লুত এই তরুণ বুক ফুলিয়ে বলেছেন, ‘এবার আমি নিজের দেশকে সমর্থন করতে পারছি, এটা আমাদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা আমরা বছরের পর বছর ধরে স্বপ্নে দেখেছি।’
ইতালির ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফ্যাবিও ক্যানাভারোর অধীনে বিশ্বকাপ অভিষেকে কলম্বিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে উজবেকিস্তান। তাই রোনালদোর প্রতি মনে গভীর ভক্তি থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে ছাড় দিতে নারাজ তারা। উজবেক ফুটবলে এখন এক নতুন জোয়ার এসেছে, যেখানে বিদেশি তারকাদের পাশাপাশি দেশের তরুণরা এখন মেতে উঠছে ফয়জুল্লায়েভ কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভের মতো নিজেদের ঘরের হিরোদের নিয়ে। তাই তো ক্যানাভারোর সুশৃঙ্খল ও জমাট পাঁচ ডিফেন্সের ছক পর্তুগালের ধীরগতির আক্রমণভাগকে স্তব্ধ করে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ‘কে’- গ্রুপের এই ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার রাত ১১টায়।
ক্যানাভারো খুব ভালো করেই জানেন, পর্তুগালের আক্রমণকে যত বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে, রোনালদোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তত বাড়বে। তবে নিজের জাত চেনাতে রোনালদোকে যেন ফিরতে চান মহাতারকার যথার্থ রূপেই। মেসি, এমবাপ্পে, হালান্ডরা যখন শুরু থেকেই পায়ের জাদুতে মাতাচ্ছেন বিশ্বকাপের এবারের আসর সেখানে মহাতারকার কোলাজে এবার নিজের ছবি জুড়ে দিতে মরিয়া সিআরসেভেন।