অচেনা হলুদের ঐশ্বর্য

প্রায় ১৫ বছর আগে কোনো এক বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণের পরিণত আম গাছটির ওপর হলুদ রঙের এই ফুলগুলো দেখে ভেবেছিলাম হয়তো চেনা-জানা কোনো ফুল। কিন্তু কাছে গিয়ে ভুল ভাঙল, একেবারেই অচেনা। আগে কোথাও দেখেছি বলেও মনে পড়ে না। সঠিক শনাক্তির জন্য ফুলটির ছবি তুলে নমুনা সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কিন্তু লতানো ফুলগুলো একেবারে আম গাছের মগডাল থেকে বাইরে বিন্যস্ত। গাছতলায় দাঁড়িয়ে ফুলের নাগাল পাওয়া কঠিন। অগত্যা ছাদে না উঠে উপায় নেই। কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনের কথা জানালে ছাদে যাওয়ার অনুমতি মিলল। ছাদে উঠে কাছ থেকে ফুলের যে প্রাচুর্য দেখেছি তা কখনো ভুলব না।

গুচ্ছবদ্ধ ফুল ও নবীন পাতার প্রাচুর্যে ঢাকা পড়েছে আম গাছটি। কয়েকটা দিনের জন্য আম গাছের অস্তিত্ব যেন ওদের কাছেই সমর্পিত। মন ভরে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিনের কাছে। তিনি জানালেন ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Dolichandra unguis-cati। কোনো বাংলা নাম নেই। অনেক অনুসন্ধান করেও লতাটি কে কখন লাগিয়েছিলেন তার কোনো খোঁজ মিলল না। তবে লতাটির আনুমানিক বয়স চল্লিশ বছর হতে পারে। পরে অবশ্য এই ফুল আরও অনেক বাগানে দেখেছি। বিশেষত, ঝিনাইদহের গাছবাড়িতে বেশ বড় একটি ঝাড় রয়েছে।        

উদ্ভিদটির ইংরেজি নাম Cats clwa vine। সম্ভবত পাতার কোল থেকে গজানো ত্রিশিখ আঁকশিটি দেখতে অনেকটা বিড়ালের থাবার মতো বলেই এমন নামকরণ। এই আঁকশি ওরা মাটি ও গাছ আঁকড়ে ধরতে ব্যবহার করে। প্রস্ফুটন প্রাচুর্য, কমনীয়তা ও উজ্জ্বল রঙের জন্য পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আদিআবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে মেক্সিকো থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত প্রায় সব দেশেই সহজলভ্য। প্রিয় আবাস উঁচু গাছ কিংবা মাটিতেও গড়াতে পছন্দ। একেকটি লতা ৫০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। গাঢ়-সবুজ রঙের পাতাগুলো পিঠাপিঠি ও যৌগিক। কাঁচা সবুজ রঙের কচি পাতাগুলো ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। তবে ফুলের অবাধ প্রস্ফুটনে পাতা অনেকটাই অদৃশ্য থাকে। গাছের কাণ্ড লতানো, কাষ্ঠল এবং ঝিল্লিরন্ধ্র দ্বারা পূর্ণ। আঁকশি কিছুটা কণ্টকিত, পাতার কোল থেকে বেরোয়। ফুল কলকে বা ভেরি আকৃতির, হলুদ-সোনালি রঙ, ৩ ইঞ্চি দীর্ঘ ও ৪ ইঞ্চি চওড়া। অসমান পাপড়ি সংখ্যা পাঁচ। ফুল একক অথবা গুচ্ছবদ্ধ। ফল রৈখিক, মসৃণ, ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চির মতো লম্বা হতে পারে। বীজ আয়তাকার ও পাখাযুক্ত, বাতাসে অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে পড়ে। বড় এবং মাঝারি, উভয় ধরনের গাছেই কন্দ অঙ্কুরিত হয় এবং কন্দ থেকে বংশবিস্তার। এদের কাছে প্রজাতির আরেকটি ফুল দেখা যায়, বৈজ্ঞানিক নাম Bignonia capreolata, তাতে লালচে কমলা রঙের ফুল ফোটে।

এরা দীর্ঘজীবী লতান উদ্ভিদ, দ্রুত বর্ধনশীল। গাছ বড় হলে দ্বিতীয় বছরেই কন্দ জন্মে। মাটিতে আঁকড়ে থাকলে ডগা থেকে কন্দ তৈরি হয়। লোকালয়, নদী বা জলাশয়ের কাছে এবং শান্ত পরিবেশে সহজে বেড়ে উঠতে পারে। সীমিত আকারে গাছ লাগিয়ে সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে এ গাছের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক