তুরাগে সেদিন কী ঘটেছিল দুই লাশ উদ্ধার

তুরাগ নদে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নৌ মিছিল ঘিরে দুই কর্মীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। উদ্ধার হওয়া দুই মরদেহকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে হত্যার অভিযোগসহ আরও চারজন নিখোঁজ থাকার দাবি ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ সদর দপ্তর তা নাকচ করেছে। এদিকে, ডিবির তদন্তে প্রাথমিকভাবে ধাওয়ার পর নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর সত্যতা মিলেছে।

জানা যায়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর (২৩ জুন) আগের দিন নৌকাযোগে তুরাগ নদে মিছিল বের করেন দলটির কিছু নেতাকর্মী। এ সময় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও পুলিশ ধাওয়া দিলে মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা পানিতে ঝাঁপ দেন। এতে ঘটনার পর গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আশুলিয়া ও আমিনবাজার এলাকার তুরাগ নদে দুজনে লাশ ভেসে ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহতরা হলেন মো. সুমন (১৭) ও আরিফুল ইসলাম রাকিব (২০)। দুজনই রাজধানীর তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা। তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

এ ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে দলটির নেতাকর্মীরা দাবি করেন। তবে গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে পুলিশের তিনটি ইউনিট এ ঘটনার তদন্তে নেমেছে বলে জানা গেছে। তার মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম আওয়ামী লীগের মিছিলে পুলিশ ধাওয়া দেওয়ায় দুজনের মৃত্যুর সত্যতা পেয়েছে।

তদন্তে ডিবির ওই টিম জানতে পারে, গত ২২ তারিখে ৩টার দিকে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫ থেকে ৩০ নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশ্যে আসেন। তুরাগের নলভোগ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিন মেম্বার এবং রানাভোলা এলাকার মামুন তাদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন। নেতাকর্মীরা রস্তমপুর ঘাট থেকে অজয় নামের এক মাঝিকে ঠিক করেন এবং আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। তারা ঘাটে পৌঁছে নৌকা থেকে নামার চেষ্টা করলে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। এ সময় তারা দ্রুত পুনরায় নৌকায় ওঠে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে তাড়াহুড়োর কারণে নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হন। পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেললে নৌকায় থাকা নেতাকর্মীরা তুরাগে ঝাঁপ দেন। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মোট সাতজনকে আটক করে। তুরাগে নদে তীব্র স্রোত থাকায় সুমন ও আরিফুল ইসলাম রাকিব নামে দুজন পানিতে তলিয়ে যান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কেউই জানতে পারেননি। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যায়।

গত ২৪ তারিখ সকাল ৭টার দিকে গাবতলী লামারঘাট এলাকায় আরিফুল ইসলাম রাকিবের মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে স্থানীয়রা আমিনবাজার নৌ পুলিশকে অবহিত করেন। নৌ পুলিশ প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে আরিফের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। তবে লাশ উদ্ধারের কিছুক্ষণ পরই খবর পেয়ে ছুটে আসেন আরিফের পরিবারের লোকজন।

নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা আব্দুল হাই বলেন, ‘আমার ছেলে ২২ তারিখে ঘুরতে গিয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, তাদেরকে বিএনপির নেতারা ও পুলিশ ধাওয়া দিয়েছে। এতে আতঙ্কে সবাই তুরাগে ঝাঁপ দেয়। সবাই উঠতে পারলেও আরিফ উঠতে পারেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে নদীতে লাশ উদ্ধারে খবর শুনে এসে দেখি, এটা আমার ছেলেরই লাশ।’ নিহত আরিফ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন বলে জানান তিনি।

আরিফের মামাতো ভাই ফারুক হোসেন বলেন, নিহত আরিফ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের দিন তারা নৌকাযোগে মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়ায় এ ঘটনা ঘটে। তবে আরিফ যে মিছিলে গিয়েছিল, তা পরিবারের লোকজনকে জানায়নি। এ কারণে পরিবারের কেউ বিষয়টি জানে না।

আমিনবাজার নৌ পুলিশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, ২৪ তারিখ সকালে অজ্ঞাত হিসেবে ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবার এসে তার মরদেহ শনাক্ত করে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন।

আর ২৫ তারিখ দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় মো. সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। পরে তার মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে সুমনের পরিবার এসে লাশ শনাক্ত করে এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিয়ে যায়।

নিহত মো. সুমনের বড় ভাই সালাহ উদ্দিন জানান, সেদিন সুমন বাসায় বলেছিল বন্ধুদের সঙ্গে তুরাগ নদে ঘুরতে যাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারি, তারা মিছিল করতে গিয়েছে। সেখানে লোকজন আর পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে তারা তুরাগে ঝাঁপ দেয়। সুমন সাঁতার না জানায় পানিতে তলিয়ে যায়। পরে লাশ উদ্ধারের খবরে থানায় গিয়ে তার মরদেহ শনাক্ত করেছি।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় কার বিরুদ্ধে মামলা করব। পুলিশ বলছে, অপমৃত্যু মামলা করতে। তাই অপমৃত্যু মামলা করে ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে এসেছি। সুমন তুরাগে একটি কাঁচাবাজারের আড়তে কাজ করত। তবে আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, মরদেহটি ভাসতে দেখে ৯৯৯-এ ফোন করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে আমাদের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় তার পকেট থেকে একটি মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করা হয়। ওই ফোনের সিম থেকে যোগাযোগ করা হলে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করেন। সুমনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা কোনো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পরিবার পুলিশকে কোনো তথ্য দেয়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে খতিয়ে দেখা হবে।  

গতকাল দিনভর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে খুন করে তুরাগ নদে ফেলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধারে কাজ চলছে। পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, সুমন তুরাগ থানার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ২২ জুন আওয়ামী লীগের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে ধাওয়া করে তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়।

সুমনসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন। শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, তুরাগ নদ থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আশুলিয়া ও তুরাগ থানা পুলিশ এসব দাবির কোনো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য বা অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসেনি। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ক্ষুণœ করার অপচেষ্টা চলছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায় পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, যারা সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তৎপর রয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে।