বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ আর নয়

চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আবাসিকের সব গ্যাস সংযোগ কেটে দিতে চায় সরকার। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে জ্বালানি সচিব এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ এ বিষয়ে গতকাল রবিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, আবাসিকে এখন যে সংযোগ রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে। কতদিনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার থেকে পাঁচ বছরের কথা বলা হয়েছে। সরকার মনে করছে আবাসিকে যে ১২ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয় তা শিল্পে সরবরাহ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে গৃহস্থালির গ্যাস ব্যবহারকারীরা এলপিজি ব্যবহার করবে। পৃথিবীর কোথাও এমন পাইপলাইনের গ্যাস নেই। আমাদের এখানেও থাকবে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এজন্য গৃহস্থালির গ্যাস উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাতিল করে দিয়েছে নতুন সরকার। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যে ঋণ চুক্তি সই হয়েছিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তাও বাতিল করতে বলা হয়েছে। এই খাত থেকে টাকা নিয়ে এলপিজির অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে করে এলপিজির প্রতি বোতলে ১১০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে।

এক খাতের ঋণের টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করা সম্ভব কি না বা এমন ধরনের কোনো নজির আছে কি না জানতে চাইলে শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, এটা এখন এডিবি এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা সহজ নয় বলে মনে করেন তিনি।

আবাসিকের গ্যাস সংযোগ এখন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আগে থেকে আবাসিকে যেসব সংযোগ রয়েছে তারা পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন। তবে আবাসিকে যে গ্যাস দেওয়া হয় তার বড় একটি অংশ চুরি হয়। যেহেতু বৈধ সংযোগ নেওয়ার উপায় নেই তাই অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে গ্যাস ব্যবহার করেন অনেকে। আবাসিক সংযোগ বৈধ হলে গ্যাস চুরির দরকার হতো না; সেক্ষেত্রে আবাসিক গ্যাস ব্যবহার থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

আবাসিকে গ্যাস সংযোগ ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় এলো জানার জন্য তিতাস এবং জ্বালানি বিভাগে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, জ্বালানি বিভাগের একটি বৈঠকে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এ পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি ওই বৈঠকে বলেন, এখন যারা আবাসিকে গ্যাস ব্যবহার করছেন তাদের গ্যাস সংযোগও চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কেটে দেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, গত ২০ এপ্রিল বেলা ১১টায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে তিতাসের উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে পুরনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং প্রিপেইড মিটার স্থাপন নিয়ে বৈঠক হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকটির কার্যপত্রে গত ৬ মে স্বাক্ষর করেন তিনি। তবে বৈঠকের কার্যপত্রে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সংযোগ কেড়ে নেওয়ার এই পরিকল্পনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বৈঠকে আবাসিকের গ্যাস সংযোগ না থাকার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও সাত পৃষ্ঠার কার্যপত্রের পঞ্চম পৃষ্ঠার ৪.৩-এ বলা হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পসমূহে বিনিয়োগকৃত ঋণ অন্য কোনো উপযুক্ত প্রকল্পে স্থানান্তর করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে নাগরিকদের জন্য এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থা সহজীকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সেই ঋণ পুনর্বিন্যাস করার বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা, সমন্বয় এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই প্যারার ৪টি শব্দ ‘প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে’ উল্লেখ করে বিষয়টির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে পাইপলাইন স্থাপন বিষয়ে তিতাসের পরিকল্পনায়ও বাধা দেওয়া হয়। কার্যপত্রের ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত ডিপিপি অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক পাইপলাইন প্রতিস্থাপন না করে কেবল যেসব এলাকায় অবস্থিত পাইপলাইন খুব জরাজীর্ণ বা প্রতিস্থাপন করা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই, শুধু সেসব এলাকায় নির্মাণ করতে হবে।’

ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ৫০ বছরের পুরনো পাইপলাইন রয়েছে। এসব পাইপলাইনে গ্যাস লিকেজের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব পাইপলাইন প্রতিস্থাপন না করে সংস্কার করে কোনোরকমে টিকিয়ে রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল সন্ধ্যায় জ্বালানি সচিবের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এখন প্রতিদিন যে গ্যাস ব্যবহার হয় তার ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে ব্যবহার হয়ে থাকে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৩৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালের দিকে আবাসিকে নতুন সংযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পুরনো গ্যাস ব্যবহারকারীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।

বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়েও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গ্যাস সংযোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘নতুন সংযোগ কখনো আর দেওয়া হবে না। পুরনোগুলোও বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবাসিকে সংযোগ উন্মুক্ত হতে পারে এমন ধারণা করা হলেও এখন উল্টো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যাদের আবাসিক সংযোগ রয়েছে তাদের সংযোগও এখন আর থাকবে না।

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের বহুতল ভবনে এলপিজি ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে এলপিজি পরিবহন জটিল একটি বিষয়। বিশ্বের অনেক দেশ এলপিজির পরিবর্তে এখন পাইপলাইনের গ্যাসকে সুবিধাজনক বিবেচনা করছে। সম্প্রতি ভারত সরকার পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে।

সরকার বরাবর সংকটের কথা বললেও আবাসিক খাত থেকে বিতরণ কোম্পানি সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করে। একজন গ্রাহক ১২ ঘণ্টা দুটি চুলা জ্বালিয়ে রাখলে যে পরিমাণ গ্যাস পুড়বে, সেই বিল ধরেই আবাসিকের বিল হিসাব করা হয়। কিন্তু তিন বেলা রান্নায় কোনো গৃহকর্তার গড়ে ১২ ঘণ্টা ব্যয় হয় না। প্রতি বেলা রান্নায় সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা করে ব্যয় হলেও অর্ধেক গ্যাস পুড়িয়ে ১২ ঘণ্টার সমান বিল দেয় ভোক্তা।