সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সেরা চিত্রগ্রাহক সুপ্তক

বড় বাজেট কিংবা অত্যাধুনিক সরঞ্জাম কোনোটিই ছিল না। শুটিং হয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই সীমাবদ্ধতা জয় করে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র আসর ‘সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর ২৭তম আসরে সেরা চিত্রগ্রাহকের পুরস্কার জিতে নিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিউল করিম সুপ্তক।

‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট (সাঁকোটা দুলছে)’ চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রহণের জন্য উৎসবের ‘এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট কম্পিটিশন’ বিভাগে এ পুরস্কার পান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণের স্বপ্ন

সুপ্তক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। শুধু তিনি নন, এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদও একই বিভাগের শিক্ষার্থী। উৎসবে সুপ্তকের অনুপস্থিতিতে তার হয়ে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন নির্মাতা জিহাদ নিজেই। আর চলচ্চিত্রটির প্রযোজক হিসেবে আছেন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী মনোজ কুমার প্রামাণিক।

কোনো কিছুই সহজ ছিল না সুপ্তকের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টায়। যখন জানতে পারেন কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ নামে একটা ডিপার্টমেন্ট আছে তখন আগ্রহবোধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে সিনেমাটোগ্রাফির ওপর আগ্রহ ছিল। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের তাগিদে সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় কোর্স করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাবস্থায় বেশ কিছু ফিল্মে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজও করেন। বিভাগের বিভিন্ন প্রজেক্টেও সিনেমাটগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তবে আজকের অবস্থানে পৌঁছতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে সিনেমাটোগ্রাফির প্রতি নিজের প্যাশন আর বন্ধু-সহপাঠীদের সঙ্গে, অনুপ্রেরণা, একসঙ্গে পথচলার অভিজ্ঞতা। বর্তমানে ফ্রিল্যান্স সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করছেন বেশ কিছু নাটক, বিজ্ঞাপন ও শর্ট ফিল্মে। ভবিষ্যতেও এ ক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়ে কাজ করে যেতে চান।

বাংলাদেশ ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে ‘সাঁকোটা দুলছে’। বাংলাদেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ম্যানপাচিত্রা’ ও জার্মানির ‘মোগাদর ফিল্ম’ এটি প্রযোজনা করেছে। ‘সাঁকোটা দুলছে’র স্বীকৃতিটাও এসেছে সেই ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কাজের সঙ্গীদের একজন জিহাদের মাধ্যমে। এই ফিল্মের ডিরেক্টর জিহাদ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক ব্যাচ জুনিয়র। সিনেমার প্রতি ভালোবাসা আর কাজের প্রতি একাগ্রতায় তাদের একটি বিন্দুতে মিলিয়েছে। সুপ্তকের পক্ষে ‘সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর ২৭তম আসরে সেরা চিত্রগ্রাহকের পুরস্কারও গ্রহণ করেন বন্ধু-সহযাত্রী জিহাদ।

ক্যামেরার পেছনের সংগ্রাম

কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সুপ্তক জানান, এটি মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার মতো বড় বাজেটের ছিল না। ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত গ্রামে শুটিং হওয়ায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সুবিধাও সীমিত ছিল। ২০২২ সালের শেষ দিকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে এর কাজ শেষ হয়।

সুপ্তক আরও জানান, ‘আমরা এমন সব গ্রামীণ এলাকায় কাজ করেছি, যেখানে মানুষের শুটিং নিয়ে তেমন ধারণাই ছিল না। অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল পুরো টিমের মধ্যে গড়ে ওঠা শক্তিশালী বন্ধন।’

স্বাধীন চলচ্চিত্রের প্রেরণা

এই আন্তর্জাতিক অর্জনকে দেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন প্রযোজক মনোজ কুমার প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘খুব সীমিত বাজেট, অল্প অভিজ্ঞতা আর একদল স্বপ্নবান তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীকে নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজকের এই অর্জন বহু বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি। এটি আমাদের আরও সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাবে।’

‘সাঁকোটা দুলছে’ সাদা-কালো ফ্রেমে তিন নারীর গল্প

সম্পূর্ণ সাদা-কালো ফ্রেমে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে গ্রামীণ বাংলাদেশের তিন নারীর জীবন তুলে ধরা হয়েছে। কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক নিপীড়নের বেড়াজাল থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখা এসব নারীর সংগ্রামের গল্পই হলো ‘সাঁকোটা দুলছে’।

চলচ্চিত্রটির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক জিহাদ নিজেই। তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকেই আমি দেখেছি কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা ও সামাজিক বিধিনিষেধ কীভাবে নারীদের জীবনকে প্রভাবিত করে। সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে এই চলচ্চিত্রে। সাংহাইয়ে নির্বাচিত হওয়া শুধু আমার নয়, পুরো টিমের জন্যই অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের বিষয়।’

শুটিং সেটে বসেই পেলেন খবর

পুরস্কার ঘোষণার সময় দেশে আরেকটি শুটিং সেটে ব্যস্ত ছিলেন চিত্রগ্রাহক সুপ্তক। হোয়াটসঅ্যাপে খবরটি পেয়ে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে সুপ্তক বলেন, ‘সত্যি বলতে, পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে আমার কোনো প্রত্যাশাই ছিল না। কারণ প্রতিযোগিতায় আরও বড় বাজেটের ও প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রজেক্ট ছিল। খবরটি শুনে ভেবেছি, হয়তো কোনো ভুল হচ্ছে। পরে প্রজেক্টের আরও কয়েকজন যখন বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তখন অন্য একটি শুটিংয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্যাপনও করতে পারিনি। এটি আমার ক্যারিয়ারের প্রথম টেকনিক্যাল অনার ও অ্যাচিভমেন্ট।’