মেঘ পাহাড় সমুদ্রে স্বপ্নিল অভিযাত্রা

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথ (জঈণ) দেশের বিদ্যমান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি সংগঠন। এটি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (ইউজঈঝ) যুব শাখা। ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া এই সংগঠনটির বর্তমানে প্রায় ১৩,৮০০টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঈণ টিম বা শাখা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি শাখা হলো কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ শাখা। এর মূল কাজ হলো স্বেচ্ছাসেবা এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

এই ধারাবাহিকতাকে সামনে রেখে রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথ (জঈণ), কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ টিম আয়োজন করে ‘অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইনিং-২০২৬’ খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারজুড়ে এক ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা সফর। সেই অভিজ্ঞতাময় যাত্রার এক অংশীদার হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল শেখার, দেখার এবং নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করার এক অনন্য সুযোগ। আর সেই যাত্রাটা শুরু হয়েছিল সাজেক ভ্যালি দিয়ে।

রাঙামাটির ছাদ

পার্বত্য জেলাগুলোতে ঘোরাঘুরির কথা বললেই ভ্রমণপিপাসুদের তালিকায় শুরুতেই আসে বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘রাঙামাটির ছাদ’ নামে পরিচিত সাজেক ভ্যালির নাম। আমাদের যাত্রাটাও শুরু হয় মেঘ, পাহাড় আর সবুজের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়া এই স্বপ্নিল জনপদ থেকে।

আমরা কুমিল্লা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি এবং দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর পৌঁছাই খাগড়াছড়ি জেলায়। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে করে যাই সাজেক। সাজেক ভ্যালির বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত। এটি আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এর আয়তন প্রায় ৭০২ বর্গমাইল এবং এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। পাহাড়, সবুজ গাছপালা, আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু রাস্তা মিলিয়ে যেন সাজেককে এক টুকরো স্বর্গ হিসেবে বিশেষায়িত করা যায়। এর অপার সৌন্দর্য, ঠা-া বাতাস, নীল আকাশ, মেঘে ঢাকা পাহাড় এবং মেঘের নরম ছোঁয়া আমাদের মনকে প্রশান্তির সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

লুসাই গ্রাম

পরে আমরা রুইলুই পাড়ার হেলিপ্যাডের কাছে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী লুসাই গ্রামটি ঘুরে দেখি। যখন আমরা এই গ্রামটির ভেতর প্রবেশ করলাম তখন তাদের জীবনযাত্রা, পোশাক, কৃষ্টি দেখে মনে হলো, আমি ভিন্ন একটি জগতে প্রবেশ করেছি। যখন তাদের পোশাকে নিজেকে আবৃত করলাম, তখন নিজেকে তাদেরই একজন মনে হলো।

এরপর সাজেক ভ্যালির অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গায় হেলিপ্যাড পরিদর্শন করি। এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই উপভোগ করা যায়, যার কারণে এখানে প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। অতঃপর আমরা সেখানে আয়োজিত একটি ‘ফায়ার সেফটি ও সচেতনতা সেমিনার’ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি, যা আমাদের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়।

কংলাক পাহাড়

পরদিন সকালে আমরা যাই কংলাক পাহাড়ে। আমি যখন কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দাঁড়ালাম, তখন যেন হঠাৎই অনুভব হলো যে, পৃথিবীর সব কোলাহল, ব্যস্ততা আর ক্লান্তি পেছনে ফেলে এক নিঃশব্দ, অনন্ত প্রশান্তির জগতে প্রবেশ করলাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল আমি ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছি মেঘের রাজ্যে, আকাশের একেবারে সীমানায়। সামনের দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ের সারি যেন সবুজ ঢেউয়ের মতো একের পর এক বয়ে চলেছে আর দূরে ভেসে থাকা সাদা মেঘের দল কখনো অলসভাবে পাহাড়ের বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো নীরবে সরে গিয়ে অন্য পাহাড়কে ঢেকে দিচ্ছে। বাতাসের হালকা শোঁ শোঁ শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক ছাড়া সবকিছু যেন নীরবতা পালন করছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব এক চিত্রকর্ম এঁকে রেখেছে।

হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক

এরপর আমরা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কে যাই। এটিকে হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্কও বলা হয়। এটি খাগড়াছড়ি শহরের পাশে ২২ একর পাহাড়ি এলাকায় বিস্তৃত এক চমৎকার ও সুশৃঙ্খল প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতুর আদলে তৈরি ঝুলন্ত সেতু, কৃত্রিম লেক, ফুলের বাগান, বাচ্চাদের দোলনা ও ছোটদের খেলার সামগ্রী, পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য টাওয়ার ও পাখির অভয়ারণ্যে এটিকে একটি মনোরম ও শান্ত পরিবেশের রূপ দান করেছে।

দেবতার গুহা

এরপর আমরা রওনা দিলাম খাগড়াছড়ির আরেক বিস্ময়, আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের উদ্দেশে। এটি খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়কের পাশে অবস্থিত। পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই স্থানটির প্রধান আকর্ষণ সেই রহস্যময় প্রাকৃতিক গুহা, যা স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কাছে ‘মাতাই হাকর’ অর্থাৎ ‘দেবতার গুহা’ নামে পরিচিত।

গুহার মুখে দাঁড়াতেই শীতল এক অন্ধকার আমাদের ঘিরে ধরল। ভেতরে পা রাখতেই অনুভব করলাম এক অজানা শিহরণ যেন শতাব্দীর নীরবতা জমে আছে এই পাথুরে দেয়ালগুলোর ভেতরে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতির এক গোপন অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

সরু পথ, অন্ধকার আর টর্চের ক্ষীণ আলো, ভয়, কৌতূহল আর বিস্ময় সব মিলিয়ে এটি ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

গুহার সেই রহস্যময় পরিবেশেই আমাদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার প্রতিযোগিতা। লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে কম সময়ে গুহাটি অতিক্রম করা। ছেলেমেয়েদের দুটি আলাদা টিমের মধ্যে সেই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এবং আমি মেয়েদের টিম থেকে প্রথম হই। সেই মুহূর্তের আনন্দ যেন হৃদয়জুড়ে এক অনির্বচনীয় অনুভূতির ঢেউ তুলে দিয়েছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই অসম্ভব।

পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়ির মোহময় ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার পরিসমাপ্তি টেনে আমরা রওনা হলাম কক্সবাজারের পথে; গন্তব্য পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত। উদ্দেশ্য, সূর্যাস্তের অপূর্ব রূপ উপভোগ করা। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ ধরে, ইনানী সৈকত অতিক্রম করে উখিয়া উপজেলার বুকে অবস্থিত এই সৈকতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মনে হলো প্রকৃতি যেন এখানে তার সমস্ত বৈচিত্র্য একসঙ্গে মেলে ধরেছে। মেরিন ড্রাইভের পথে পাটুয়ারটেকের দিকে যেতে যেতে চোখে ভেসে ওঠে রঙিন সাম্পান, মাছ ধরে ঘরে ফেরা জেলেদের ব্যস্ততা আর সৈকতজুড়ে মাছ কেনাবেচার জীবন্ত দৃশ্য। আর সৈকতে পৌঁছানোর পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম পাথর, সমুদ্র আর পাহাড়ের অনন্য সংমিশ্রণে গড়া এক কল্পরাজ্যের মাঝে। একই স্থানে পাহাড়, প্রবালপাথর আর বিস্তীর্ণ নীল সমুদ্রের এমন মেলবন্ধন সত্যিই বিরল, যা খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।

আদিনাথ মন্দির

পরদিন আমরা যাই বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। সেখানে আমরা পরিদর্শন করি বিখ্যাত আদিনাথ মন্দির; যা মৈনাক পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান। পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশের দৃশ্য যেন এক অনির্বচনীয় শান্তি এনে দিল মনে। এরপর ঘুরে দেখলাম ঐতিহ্যবাহী লবণ মাঠ ও শুঁটকি বাজার; যেখানে স্থানীয় জীবনের ব্যস্ততা আর জীবিকার সহজ রূপ চোখে পড়ে। সবকিছু দেখার পর আমরা আবার কক্সবাজারে ফিরে এলাম।

এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম আর সামান্য কেনাকাটা শেষে আমরা কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দিলাম। এভাবেই ধীরে ধীরে শেষ হলো আমাদের এই স্মরণীয় ভ্রমণযাত্রা, যার প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি অনুভব মনের গহিনে রয়ে যাবে দীর্ঘদিন, স্মৃতির পাতায় হয়ে থাকবে এক অনির্বচনীয় মায়া।

লেখক : শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত