মহানাটকীয় এক ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটায় সেলেসাওরা। অভিজ্ঞ কাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর, ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি করা অবিশ্বাস্য এক গোলে জয় উল্লাসে মাতে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই জয়ের ফলে ব্রাজিলের হেক্সা বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন এখনো টিকে রইল।
ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিল বল পজিশনে স্পষ্ট আধিপত্য (প্রায় ৭৫%) বজায় রাখলেও জাপানের লো-ব্লক ডিফেন্স ভাঙতে পারছিল না। উল্টো ম্যাচের ধারার বিপরীতে ৪৪ মিনিটে এক মারাত্মক ভুল করে বসে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ।
মাঝমাঠে আক্রমণ গোছানোর মুহূর্তে অধিনায়ক দানিলোর একটি ভুল পাস ইন্টারসেপ্ট করেন জাপানের সানো। তিনি গতি বাড়িয়ে ব্রাজিলের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি কাসেমিরোকে পরাস্ত করেন। কাসেমিরো আগের একটি হলুদ কার্ডের কারণে ফাউল করার ঝুঁকি নিতে পারেননি। সানো বক্সের বাইরে থেকে এক নিচু শটে বল জালে জড়ান, যা গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের নাগালের বাইরে ছিল। প্রথমার্ধে এটিই ছিল জাপানের একমাত্র আক্রমণ।
অন্যদিকে, ডানপ্রান্তে তরুণ উইঙ্গার রায়ান সম্পূর্ণ ব্লকড থাকায় ব্রাজিলের আক্রমণগুলো ছিল বামপ্রান্ত-নির্ভর ও ছন্নছাড়া। তדוপরি, বিরতির ঠিক আগে মাঝমাঠের প্রধান তারকা লুকাস পাকেতা ডান পায়ে চোট (ইনজুরি) পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়লে ব্রাজিলের ওপর গভীর কালো মেঘ জমা হয়।
বিরতির পর ডাগআউট থেকে সম্পূর্ণ নতুন রণকৌশল নিয়ে মাঠে নামে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। পাকেতার ইনজুরির পর মাঠে বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়। এনদ্রিককে জাপানি ডিফেন্ডারদের সাথে বক্সের ভেতর ব্যস্ত রেখে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রায়ানকে দিয়ে উইংয়ের গতি বাড়িয়ে দেয় ব্রাজিল।
খেলার গতি পরিবর্তনের পাশাপাশি আনচেলত্তি মাঠের দুই প্রান্ত থেকে অনবরত ক্রস করার নির্দেশ দেন। কারণ জাপানের সেন্ট্রাল ডিফেন্স খুব নিঁখুতভাবে মাঝখানটা আটকে রেখেছিল। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ছোটখাটো গড়নের খেলোয়াড়দের জন্য এটি আদর্শ না হলেও, ডিফেন্ডারদের ওপরে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আক্রমণের চাপ বাড়ানো ব্রাজিল দ্রুতই তার ফল পায়। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে আসে ব্রাজিলের কাঙ্ক্ষিত সেই সমতাসূচক গোল। কর্নার ও উইং থেকে আসা একের পর এক ক্রসের ধারাবাহিকতায় বক্সের ভেতর দারুণ এক হেডে জাপানি গোলরক্ষক জিওন সুজুকিকে পরাস্ত করেন কাসেমিরো। প্রথমার্ধের ভুলের জন্য তীব্র সমালোচনার শিকার হওয়া এই অভিজ্ঞ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ম্যাচের এক ঘণ্টা পেরোনোর আগেই গোল করে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন জানান দেন। ব্রাজিলের জার্সিতে ৯০ ম্যাচে এটি কাসেমিরোর ১০ম গোল, যা পুরো দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তোলে।
১-১ সমতার পর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নাটকীয়তার চূড়ান্ত रूप দেখে হিউস্টনের স্টেডিয়াম। ম্যাচের যোগ করা সময়ে (ইনজুরি টাইমে) ডানপ্রান্ত থেকে তরুণ রায়ান দারুণ এক আক্রমণ রচনা করেন। বল চলে যায় বক্সের ভেতর থাকা ব্রুনো গিমারসের কাছে। ব্রুনো তার চমৎকার ড্রিবলিং ও ভিশন কাজে লাগিয়ে আলতো করে বল বাড়িয়ে দেন ফাঁকায় থাকা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির উদ্দেশ্যে।
মার্তিনেল্লিকে সাধারণত উইঙ্গার হিসেবে দেখা গেলেও আনচেলত্তি তাকে ইনসাইড মিডফিল্ডার পজিশনে খেলিয়েছিলেন। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে জাপানি রক্ষণভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ান মার্টিনেল্লি। উল্লাসে ফেটে পড়ে ব্রাজিলিয়ানরা।
জাপানের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ভেঙে শেষ আটে পা রাখল ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ব্রাজিলের জন্য পরবর্তী রাস্তা মোটেও সহজ নয়। শেষ ১৬তে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে অথবা শক্তিশালী আইভরি কোস্ট। এছাড়া টুর্নামেন্টের সমীকরণ অনুযায়ী, সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে ব্রাজিলের। তবে আপাতত জাপানের বিপক্ষে এই রোমাঞ্চকর জয় ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।