আমার হৃদয়ে ব্রাজিল, আবেগে জাপান

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ নিয়ে কথা বলেছেন 'সাদা পেলে' নামে খ্যাত জিকো

ফুটবল মানচিত্রে যখনই ব্রাজিল আর জাপানের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়, আমার হৃদস্পন্দন একটু হলেও বেড়ে যায়। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি! একদিকে আমার নিজের দেশ, আমার নাড়ির টান ব্রাজিল। অন্যদিকে সুদূর এশিয়ার এক দেশ, যেখানে ফুটবলের বীজ বুনে দিতে আমি আমার জীবনের একটা বড় সময় উৎসর্গ করেছি, যে দেশকে আমি নিজের ঘরের মতোই ভালোবাসি। সোমবার যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহালড়াইয়ে এই দুই দল মুখোমুখি হবে, তখন অনেকেই হয়তো ভাবছেন আমার মন দুভাগে ভাগ হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে, মাঠে যখন খেলা শুরু হবে, আমি গ্যালারির আর দশটা সাধারণ ব্রাজিলিয়ানের মতোই বুক চিতিয়ে আমাদের সেলেসাওদের জন্যই গলা ফাটাব। কারণ, দিনশেষে আমি একজন ব্রাজিলিয়ান।

তবে মনে রাখবেন, যদি জাপান জিতেও যায়, আমি কিন্তু কষ্ট পাব না। কারণ আমি জানি, জাপান কোনো অঘটন ঘটিয়ে জিতবে না; তারা এখন সত্যি অর্থেই সুন্দর এবং বিশ্বমানের ফুটবল খেলছে। তিতে বা অন্য কারও আমল আর আজকের আমল এক নয়। এই জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ ব্রাজিলের নেই।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে ব্রাজিল আর জাপান মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল। আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে। সেই ম্যাচে জাপানের ডাগআউটে কোচ হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি নিজেই।

ম্যাচ শুরুর আগের মুহূর্তগুলো কতটা আবেগঘন ছিল, তা আজ ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়। ম্যাচের আগে আমি আমার জাপানি ফুটবলারদের ড্রেসিংরুমে ডেকে বলেছিলাম ‘স্কুলে আমাকে যেভাবে শেখানো হয়েছে, মাঠে আজ আমি ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত সেভাবেই গাইব। কিন্তু রেফারি যখনই খেলার প্রথম বাঁশিটি বাজাবেন, তখন থেকে আমি শতভাগ জাপানের।’ ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেরুর কোচ হিসেবে মাঠে নামা আমাদের কিংবদন্তি দিদির কথা মনে পড়ছিল আমার। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।

সেবার আমরা ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমার্ধটা যদি আমরা লিড নিয়ে শেষ করতে পারতাম, ম্যাচের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে রোনালদো গোল করে সমতা ফেরায়। রোনালদো সবসময়ই সংবাদমাধ্যমে বলে বেড়ায় যে আমি নাকি তার ফুটবলীয় আদর্শ! অথচ ও রসিকতা করে ভুলে যায় যে, ওর পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র হেড থেকে করা গোলটি ও দিয়েছিল আমারই জাপানের বিপক্ষে! (হাসি)

২০০৬ সালের সেই জাপান আর ২০২৬ সালের এই জাপানের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তখন জাপান তাদের মাত্র তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছিল, আর আজ তারা বিশ্বমঞ্চের নিয়মিত পরাশক্তি। জাপানি ফুটবলের এই অবিশ্বাস্য বিবর্তনের মূল কারণ হলো ইউরোপীয় ফুটবলে তাদের খেলোয়াড়দের আধিপত্য।

আমাদের সময়ে জাপানি ফুটবলাররা দেশের বাইরে খেলার কথা ভাবতেই পারত না। আর আজ? এবারের বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ২৩ জনই খেলছেন বুন্দেসলিগা, সিরি এ কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো শীর্ষ স্তরে। ঘরোয়া লিগে খেলা তিনজনের মধ্যে দুজন গোলরক্ষক, আর অন্যজন আমার স্নেহধন্য ইউতো নাগাতোমো, যে মূলত একজন অভিজ্ঞ লিডার হিসেবে নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলছে।

অতীতে বেলজিয়াম বা ক্রোয়েশিয়ার কাছে জাপানের বিদায় টেকনিক্যাল কারণে হয়নি, হয়েছিল মূলত মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতায়। ওরা গোল খেয়ে বা বিপদে পড়লে ভেঙে পড়ত। কিন্তু বর্তমান জাপান প্রতিকূলতা জয় করতে শিখেছে। স্পেন, জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের হারিয়ে আসা এই দলটা এখন মানসিকভাবে যেকোনো শক্তির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।

তাছাড়া, জাপানের বর্তমান কোচ হাজিমে মরিয়াসুকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। আমার জে-লিগের খেলার দিনগুলোতে ও আমার প্রতিপক্ষ ছিল। ও দুর্দান্ত টেকনিকের একজন মিডফিল্ডার ছিল, যে আজ একজন দূরদর্শী কোচ হয়ে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তিও আমার খেলোয়াড়ি জীবনের চেনা প্রতিপক্ষ। কার্লো আর মরিয়াসু দুজনেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন, তবে কেউ কখনো নোংরা ফুটবল খেলতেন না। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠের খেলাটা নিখুঁতভাবে পড়তে পারতেন বলেই আজ কোচ হিসেবে তারা দুজনই বিশ্বসেরা।

এবার একটু নিজের ঘরের কথায় আসি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে আমাদের বর্তমান নম্বর সেভেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলসংখ্যা এখন ৫। ও আমাকে ছুঁয়ে ফেলেছে।
 

ফ্ল্যামেঙ্গোর একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণকে নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত। আমি ওকে ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি। ও কতটা কষ্ট করে, কতটা পরিশ্রম করে আজকের এই অবস্থানে এসেছে, তা আমি জানি। ও একজন খাঁটি প্রফেশনাল। ঈশ্বরের ইচ্ছায় ওর সামনে আরও দারুণ কিছু অপেক্ষা করছে।

সেলেরাও জার্সিতে ভিনির এই গোলবন্যার পেছনে কার্লো আনচেলত্তির অবদান অনস্বীকার্য। রিয়াল মাদ্রিদে ভিনিকে যেভাবে ব্যবহার করে ও সাফল্য পেয়েছে, আমাদের জাতীয় দলেও ঠিক তার সেরা পজিশনটি খুঁজে বের করেছে। আনচেলত্তির অধীনে ভিনির পরিসংখ্যানই (১৩ ম্যাচে ৭ গোল) কথা বলছে। ও এখন শারীরিকভাবে, টেকনিক্যালি এবং মানসিকভাবে শতভাগ প্রস্তুত।

টুর্নামেন্টের শুরুতে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর ব্রাজিলের ছন্নছাড়া খেলা দেখে আমি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তবে হাইতি এবং বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আমাদের ছেলেরা যেভাবে ছন্দ ফিরে পেয়েছে, তা প্রশংসনীয়। আনচেলত্তি এখন তার সেরা একাদশ এবং কম্বিনেশনটি পেয়ে গেছেন। আর শেষ ম্যাচে নেইমারের মাঠে ফেরার চেয়ে স্বস্তির খবর ব্রাজিলের জন্য আর হতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত