একসময় গ্রামের আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ আর তাতে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির নিপুণ বাসা ছিল চিরচেনা দৃশ্য। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতির পাতায়। তালগাছ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে গেছে বাবুই পাখির ঠিকানাও। প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তারা এখন বেছে নিচ্ছে নারিকেল ও খেজুর গাছ। একসময় যে বাবুই পাখির বাসা হরহামেশাই দেখা যেত, সেই বাসাই এখন খুঁজে পাওয়া দায়। বর্তমানে উপজেলার এই দুটি গাছ ছাড়া অন্য কোথাও বাবুই পাখির কোনো বাসা নেই। তাই ব্যতিক্রমী এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন।
স্থানীয়দের কাছে বাবুই পাখির বাসা মানেই তালগাছ এমন ধারণাই দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তবে সেই ধারণার ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য দেখা গেছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের হিজলী পাবনাপাড়া গ্রামের হাড়িয়ার বিলসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর শেখ (৫৫)-এর বাড়ির একটি নারিকেল গাছ এবং আরেকটি বাড়ির অদূরের একটি খেজুর গাছে একাধিক বাবুই পাখির বাসা তৈরি হয়েছে। লুৎফর শেখ ওই এলাকার মৃত মকবুল শেখের ছেলে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মালঞ্চি বাজার থেকে সোনাপুর সড়কের হিজলী পাবনাপাড়া হাড়িয়ার বিল এলাকায় লুৎফর শেখের বাড়ির নারিকেল গাছে ঝুলছে বাবুই পাখির একাধিক বাসা। সড়ক দিয়ে চলাচলকারী ভ্যান, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের যাত্রীরা যানবাহন থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাসাগুলো দেখছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন এবং বিস্ময় ও মুগ্ধতার সঙ্গে দৃশ্যটি উপভোগ করছেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই মাস আগে বাবুই পাখিগুলো লুৎফর শেখের বাড়ির নারিকেল গাছে ও তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী খেজুর গাছে বাসা তৈরি শুরু করে। বর্তমানে গাছ দুটিতে অর্ধ শতাধিক বাসা দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু হিজলী পাবনাপাড়া গ্রাম নয়, পুরো বাগাতিপাড়া উপজেলায় বর্তমানে এ দুটি গাছ ছাড়া আর কোথাও বাবুই পাখির বাসা নেই। এমনকি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারাও এর আগে কখনো নারিকেল বা খেজুর গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখেননি বলে জানিয়েছেন।
হিজলী পাবনাপাড়া এলাকার লুৎফর শেখের পুত্রবধূ নদীয়া আক্তার বলেন, তিনি এলাকায় আগে কখনো এ ধরনের বাসা দেখেন নি। প্রায় দুই মাস আগে পাখিগুলো তার বাড়িতে বাসা বেঁধেছে। তিনি আরও বলেন, জানতাম বাবুই পাখি সাধারণত তাল গাছেই বাসা বাঁধে। এখন দেখছি, তারা নারিকেল গাছেও বাসা তৈরি করেছে। এটি দেখতে অনেক লোকজন আসছেন ছবি উঠাচ্ছেন।
ওই এলাকার আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, আমি উপজেলার কোথাও এ ধরনের বাসা দেখিনি। বই-পুস্তকে পড়েছি, ইউটিউবে দেখেছি। আমাদের এলাকায় আগে কখনো নারিকেল বা খেজুর গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা যায়নি। এখন এ গাছগুলোতে বাসা তৈরি করায় অনেকেই এটি দেখতে আসছেন। এ রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারীরাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাসাগুলো দেখছেন। গাছগুলোতে পাখিগুলো নিরাপদেই বসবাস করছে।
বাবুই পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে সুইট জানান, নারিকেল ও খেজুর গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখে তারা মুগ্ধ।তিনি বলেন, সেখানেই তাল গাছ দেখি একবার হলেও তাকিয়ে দেখি বাবুই পাখির বাসা আছে কিনা কিন্তু এলাকায় বাবুই পাখির বাসা দেখতে পাওয়া যায় না। তাই এখানে দেখতে এসে বাবুই পাখির বাসার ছবি উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
হিজলী পাবনাপাড়ার স্থানীয় ইউপি সদস্য মদল শেখ বলেন, বিষয়টি সত্য জানিয়ে বলেন, প্রায় দুই মাস আগে বাবুই পাখিগুলো এখানে বাসা তৈরি করেছে। আগে তালগাছেই এদের বাসা দেখা যেত। এখন নারিকেল ও খেজুর গাছে বাসা তৈরি করাটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমার জানা মতে, বর্তমানে উপজেলার অন্য কোথাও বাবুই পাখির বাসা আর নেই। স্থানীয়দের বাসাগুলোর দিকে নজর রাখতে বলেছি যেন। পাখিরা যেখানে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবে সেখানেই থাকবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, সময় ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাবুই পাখি তালগাছের বিকল্প হিসেবে নারিকেল ও খেজুর গাছ বেছে নিয়েছে। এটি তাদের অভিযোজন ক্ষমতারই একটি উদাহরণ। স্থানীয়দের প্রতি আমার অনুরোধ, কেউ যেন পাখিগুলোকে বিরক্ত না করেন বা তাদের বাসার কোনো ক্ষতি না করেন। সবাই সহযোগিতা করলে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।