বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় নেদারল্যান্ডসকে। জোহান ক্রুইফ, মার্কো ফন বাস্তেন কিংবা ভার্জিল ফন ডাইকের মতো একের পর এক যুগান্তকারী ও কিংবদন্তি ফুটবলারদের জন্ম দিয়েছে এই দেশ। কিন্তু এত সমৃদ্ধ ফুটবল ইতিহাস, নিখুঁত ফুটবলীয় সংস্কৃতি আর বিশ্বমানের একাডেমি থাকা সত্ত্বেও 'দ্য অরেঞ্জ' খ্যাত এই দলটি আজ পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি।
তাদের এই ট্রফিহীন বেদনার পেছনে ফুটবলীয় দক্ষতার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাইব্রেকার নামক এক নিষ্ঠুর লটারি আর অপ্রত্যাশিত পেনাল্টি শুটআউটের নির্মম ভাগ্য। মেক্সিকোর মাটিতে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও ডাচদের সেই পুরোনো আর পরিচিত নিয়তিরই নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি ঘটল।
আফ্রিকান জায়ান্ট কিলার মরক্কোর বিপক্ষে নকআউটের মহানাটকীয় ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষেও ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল নেদারল্যান্ডস। যখন মনে হচ্ছিল তারা অনায়াসেই পরের রাউন্ডে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে) গোল হজম করে বসে ডাচরা। ম্যাচের বাকি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে মরক্কোর ডিফেন্সকে আর ভাঙতে পারেনি তারা। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে ২-৩ ব্যবধানে হেরে চোখের জলে আরও একবার বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হলো ইউরোপের এই পরাশক্তিকে।
অথচ এই বিদায়ের পেছনে লুকিয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর পরিসংখ্যান। বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় সম্পূর্ণ অপরাজেয় কমলারাজ্য। ২০০৬ সালের ২৫ জুন জার্মানি বিশ্বকাপের সেই কুখ্যাত এবং কার্ডের রেকর্ড গড়া 'ব্যাটল অফ নুরেমবার্গ' ম্যাচে পর্তুগালের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরেছিল তারা। সেই ম্যাচের পর থেকে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বিশ্বকাপের মূল সময়ের ভেতর ডাচদের হারাতে পারেনি পৃথিবীর কোনো দল। এর মাঝের সবকটি বিশ্বকাপে তাদের বিদায় এসেছে হয় অতিরিক্ত সময়ে, নয়তো পেনাল্টি শুটআউটের লটারিতে।
বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চ ডাচদের জন্য সবসময়ই এক বড় আক্ষেপের নাম। মোট তিনবার (১৯৭৪, ১৯৭৮ এবং ২০১০) তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলেও প্রতিবারই ট্রফির একদম কাছ থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে জোহান ক্রুইফের সেই বিখ্যাত 'টোটাল ফুটবল' যুগের দলটি ফাইনালে শুরুতে এগিয়ে গিয়েও পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। তার পরের বার ১৯৭৮ সালে টানা দ্বিতীয় ফাইনালে উঠে স্বাগতিক আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ ব্যবধানে পরাস্ত হয় তারা। আর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে স্পেনের আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে স্বপ্ন ভাঙে ডাচদের।
ফাইনাল বাদ দিলে নকআউট পর্বে ডাচদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হলো পেনাল্টি শুটআউট। ১৯৯৮ সালের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে পেনাল্টিতে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ক্রোয়েশিয়ার কাছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও হেরেছিল তারা। এর ঠিক দুই দশক পর, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ১২০ মিনিট গোলশূন্য ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হারে লুই ফন হালের দল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে সেই একই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-২ সমতায় ফিরেছিল ডাচরা, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি সেই পেনাল্টি শুটআউটেই। আর এবার ২০২৬ সালেও মরক্কোর বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে অপরাজিত থেকেও টাইব্রেকারের ভাগ্যই তাদের ছিটকে দিল।
নেদারল্যান্ডসের এই ট্রফিহীন ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে ফুটবলের চিরসবুজ সব সুপারস্টারদের গল্প। ১৯৭০-এর দশকে তিনবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী জোহান ক্রুইফকে বলা হয় আধুনিক ফুটবলের জনক, যিনি বিশ্বকে চিনিয়েছিলেন টোটাল ফুটবল। তাঁর সাথে ১৯৭৪ সালের ফাইনালে গোলদাতা অক্লান্ত মিডফিল্ডার জোহান নেস্কেন্স কিংবা বিশ্বকাপে ডাচদের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা জনি রেপ এবং রব রেনসেনব্রেঙ্কের মতো উইঙ্গাররা বিশ্ব কাঁপিয়েছেন। আশির দশকের শেষের দিকে মার্কো ফন বাস্তেন, রুদ খুলিত এবং ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের 'সোনালী ত্রয়ী' ডাচদের ১৯৮৮ সালের ইউরো কাপ জেতালেও বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি। নব্বই ও দুই হাজার দশকের শুরুতে ডেনিস বার্গক্যাম্প, ক্লারেন্স সিডর্ফ, এডগার ডাভিডস, কিংবদন্তি গোলরক্ষক এডউইন ফন ডার সার এবং একই দিনে জন্ম নেওয়া দুই গোলমেশিন প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট ও রুদ ফন নিস্টেলরয় ইউরোপীয় ফুটবল শাসন করেছেন। এমনকি হালের আরিয়েন রোবেন, রবিন ফন পার্সি, ওয়েসলি স্নাইডার কিংবা বর্তমানের ভার্জিল ফন ডাইক ও কোডি গাকপোরাও ডাচ ফুটবলের সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দাপট, শক্তিশালী জাতীয় লিগ, অসাধারণ প্রতিভা তৈরির কারখানা আর বিশ্বমানের ফুটবল সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও বড় টুর্নামেন্টের এই নির্মম ট্র্যাজেডি ডাচ ফুটবলকে এক অদ্ভুত রূপ দিয়েছে। বারবার সুন্দর ফুটবল খেলে, বিশ্বমঞ্চে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েও ডাচদের ট্রফিহীন বিদায় একটি কথাই প্রমাণ করে—ফুটবলে সব পেয়েও না-পাওয়ার বেদনা আর হারার আসল অর্থ কী, তা নেদারল্যান্ডসের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।