কার্লো আনচেলত্তি যখন ব্রাজিলের কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন থেকেই তিনি একটি দর্শনের কথা বারবার বলে আসছিলেন—“আমি চাই না এই সেলেসাও দলের একটি মাত্র নির্দিষ্ট পরিচয় থাকুক, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী এর রূপ হোক ভিন্ন ভিন্ন।”
হিউস্টনের মাঠে জাপানের বিপক্ষে সোমবার ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে আনচেলত্তির সেই 'গিরগিটি' দর্শনই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের ত্রাতা হয়ে উঠল।
প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া এবং মাঝমাঠের প্রধান তারকা লুকাস পাকেতার চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার পর অনেকেই যখন ব্রাজিলের বিদায় দেখছিলেন, তখন আনচেলত্তির সাহসিকতা এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতাই ব্রাজিলকে নিয়ে গেল বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে।
প্রথম দুই ম্যাচে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪-৩-১-২ ফর্মেশনটি দারুণ কাজ করেছিল। জাপানের বিপক্ষেও প্রথম ১৫-২০ মিনিট ছন্দ ঠিক ছিল। কিন্তু জাপানি কোচ যখন কুলিং ব্রেকের (হাইড্রেশন বিরতি) সময় তাদের কৌশল বদলে ফেলেন, তখনই খেই হারিয়ে ফেলে ব্রাজিল। অধিনায়ক দানিলোর এক মারাত্মক ভুলে ২৯ মিনিটে জাপানের সানো গোল করে বসেন।
এর ওপর বিরতির ঠিক আগে ডান ঊরুর চোটে পড়েন লুকাস পাকেতা। নকআউটের চাপ, এক গোল পিছিয়ে থাকা এবং প্রধান প্লে-মেকারের চোট—যেকোনো কোচের জন্যই এটি একটি দুঃস্বপ্ন। কিন্তু আনচেলত্তি বিরতিতে জুয়া খেললেন। পাকেতার জায়গায় তিনি মাঠে নামালেন তরুণ স্ট্রাইকার এনড্রিককে। মিডফিল্ডার তুলে নিয়ে ব্রাজিল ফিরে গেল ৪-স্ট্রাইকার বা অল-আউট অ্যাটাকিং ফর্মেশনে।
'ফুটবলে ভুল থাকবেই, কেউ নিখুঁত নয়। তবে আমাদের সামর্থ্য আছে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার। দ্বিতীয় অর্ধে আমরা সেটাই করেছি', বলেছেন কার্লো আনচেলত্তি
চারজন স্ট্রাইকার (ভিনিসিয়ুস, এনদ্রিক, মাথেউস কুনহা এবং রায়ান) মাঠে নামতেই জাপানের রক্ষণভাগ পুরোপুরি চওড়া হয়ে যায়। দুই উইং দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শুরু করে ব্রাজিল। বিশেষ করে রাইট-উইংয়ে সাবেক ভাস্কো দা গামার তরুণ উইঙ্গার রায়ানের গতি জাপানের ডিফেন্সকে তছনছ করে দেয়।
কৌশল বদলের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় (৫৪ মিনিটে) গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের একটি নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান কাসেমিরো।
ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোল না পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে জাদুকরী এক সোলো রানে চারজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে শট নিয়েছিলেন, যা জাপানি কিপার জিওন সুজুকির হাতে লেগে পোস্টে প্রতিহত হয়। তবে এই ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন মাঝমাঠের ইঞ্জিন ব্রুনো গিমারেস। পাকেতা চলে যাওয়ার পর মাঝমাঠের পুরো দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেন ব্রুনো। কখনো খাঁটি 'নম্বর ৮' হিসেবে রক্ষণ সামলেছেন, আবার কখনো বক্সের ভেতর ঢুকে আক্রমণ তৈরি করেছেন। ইনজুরি টাইমে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির করা জয়সূচক গোলটির অ্যাসিস্টও আসে তার পা থেকে।
চলতি বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচে এটি ব্রুনোর চতুর্থ অ্যাসিস্ট। ১৯৮২ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি জিকোর পর কোনো ব্রাজিলিয়ান এক বিশ্বকাপে এতগুলো অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। এখন ১৯৭০ বিশ্বকাপে করা পেলের ঐতিহাসিক ৬টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড ছুঁতে ব্রুনোর প্রয়োজন আর মাত্র ২টি অ্যাসিস্ট।
ম্যাচের অন্যতম সেরা চাল ছিল মাথেউস কুনহাকে তুলে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে নামানো। উইঙ্গার মার্তিনেল্লিকে আনচেলত্তি পজিশন বদলে একটু ভেতর ও পেছনের দিকে খেলান। ভিনিসিয়ুস মাঠে থাকায় মার্তিনেল্লি নিজের চেনা উইং পজিশন ছেড়ে যেভাবে ভেতর থেকে অপারেট করলেন এবং যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোলটি এনে দিলেন, তা ব্রাজিলের বেঞ্চের গভীরতা ও বৈচিত্র্যকেই প্রমাণ করে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী রবিবার নিউ জার্সিতে মাঠে নামবে ব্রাজিল। তবে তাদের প্রতিপক্ষ এখনো চূড়ান্ত নয়; আজ রাতে ডালাসে হতে যাওয়া নরওয়ে বনাম আইভরি কোস্ট ম্যাচের জয়ী দলের মুখোমুখি হবে তারা।
দুটি দলের খেলার শৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। নরওয়ের ফিজিক্যাল ফুটবল বনাম আইভরি কোস্টের গতি—প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, ফুটবল বিশ্ব এখন জানে যে আনচেলত্তির ব্রাজিলের কোনো বাঁধা ধরা ছক নেই। তারা নরওয়ের বিপক্ষে এক রূপ ধারণ করতে পারে, আবার আইভরি কোস্টের বিপক্ষে বদলে যেতে পারে মুহূর্তেই। এই 'আনপ্রেডিক্টেবিলিটি' বা অনিশ্চয়তাই এখন বিশ্বকাপের বাকি অংশে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড।
ব্রাজিল জাপানকে হারানোর পর জার্মান ভবিষ্যৎদ্রষ্টাকে নেইমারের খোঁচা
'একটি ভুল দিয়ে আমাকে বিচার করা যাবে না'- ক্যাসেমিরো