ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে কিছু ঘটনা সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় গতিপথ নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় তেমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। অল্পবয়সী এই সেনাপতির দূরদর্শিতা, সাহস ও সামরিক দক্ষতার মধ্য দিয়ে সূচিত হয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রথম সফল অধ্যায়। মুসলমানদের অমায়িক আচরণে মুগ্ধ হয়ে এ অঞ্চলের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। ভারতের সংস্কৃতিতে আরব সংস্কৃতির এক অভিনব মিশ্রণ ঘটে।
৭১২ সালের সিন্ধু অভিযানই ভারতে মুসলমানদের প্রথম সফল অভিযান ছিল। ইতিপূর্বে ভারতের সঙ্গে আরবের কোনো বিরোধ ছিল না। প্রথম বিরোধ দেখা দেয় ৭০৮ সালে, যখন মুসলমানদের একটি জাহাজ বহর সিন্ধুর দেবল বন্দরের কাছে জলদস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত হয় এবং জাহাজ বহরের যাত্রী ও সম্পদ অপহৃত হয়। এ বহরে ছিল ৮টি জাহাজ। জাহাজগুলোতে ছিল সিংহলের রাজার জন্য প্রেরিত খলিফা ওয়ালিদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপঢৌকন। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিষয়টি অবগত হয়ে সিন্ধুর রাজা দাহিরকে পত্রের মাধ্যমে কৈফিয়ত তলব করেন এবং অপহৃত সবকিছু ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। রাজা দাহির হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পত্রের ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের অনুমতি নিয়ে রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে পরপর ৩টি সামরিক অভিযান চালান। প্রথম দুটি অভিযান চালান পর্যায়ক্রমে উবায়দুল্লাহ ও বুদাইলের নেতৃত্বে। এ দুটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে ৭১২ সালে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানো হয়। মুহাম্মদ বিন কাসিম জুলাইয়ের ২ তারিখে সিন্ধু বিজয় করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ হাজার। সংখ্যায় কম হলেও সৈন্যরা ছিল দক্ষ, অভিজ্ঞ, সাহসী ও বিচক্ষণ।
তা ছাড়া অভিযানে ভারতীয় জাঠ ও মেঠ সম্প্রদায় মুসলমানদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে। তারাও ছিল বলিষ্ঠ ও সাহসী। তারা রাজার দ্বারা অত্যাচারিত ও নিগৃহীত ছিল। মুহাম্মদ বিন কাসিম একে একে দেবল, মেরুন, সেহোরান, ব্রাহ্মণাবাদ, আলোর, মুলতান প্রভৃতি জয় করেন। এই প্রথমবারের মতো ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা মুসলমানদের অধিকার আসে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রকৃত নাম ইমদাদ উদ্দিন মুহাম্মদ। তার পিতার নাম আল কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল হাকাম। মায়ের নাম হাবিবা আল উজমা। শৈশবেই তিনি পিতাকে হারান। সংসারের হাল ধরেন তার মা। তিনি একজন শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মহিলা ছিলেন। তিনি পুত্রকে নৈতিক ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণ দেন। তার লেখাপড়ার যথাযথ বন্দোবস্ত করেন। ছোট থেকেই মুহাম্মদ বিন কাসিম সমরশাস্ত্রে আগ্রহী ছিলেন। ঘোড়ায় চড়া, তলোয়ার চালানো ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
ভারতের কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, বিধর্মীদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। মানুষকে ধর্মান্তর করার লক্ষ্যে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতে অভিযান চলান, এটা সঠিক নয়। বরং এ অঞ্চলের মানুষ মুসলমানদের আচার-ব্যবহার, সততা, নিষ্ঠা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর সিন্ধু অভিযানের প্রত্যক্ষ কারণ হলো, মুসলমানদের জাহাজ বহর লুণ্ঠিত হওয়া এবং যাত্রী ও সম্পদ অপহৃত হওয়া। এ ছাড়া আরও কয়েকটি কারণ হলো, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, তখন রাজা দাহির তার শত্রুদের সাহায্য করেন। দ্বিতীয়ত, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনকালে পারস্যের কিছু বিদ্রোহী ভারতে পালিয়ে এলে রাজা দাহির তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেন। তৃতীয়ত, মুহাম্মদ বিন কাসিমের আগে যে দুটি সামরিক অভিযান রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে চালানো হয়, তাতে মুসলমানরা পরাজিত হলে যুদ্ধবন্দিদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। বর্ণিত কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের জন্য ভারতে সামরিক অভিযান চালানো অপরিহার্য হয়ে যায়।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক