কৃষকের ধান রক্ষার জন্য সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ড্রেজারের মাধ্যমে নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী রাউতারা রিং বাঁধ। এর পেছনে প্রতিবছর ব্যয় হয় কোটি কোটি টাকা। গত প্রায় ৪০ বছর ধরে চলছে বাঁধ ভাঙা ও গড়ার খেলা। সেই সঙ্গে চলছে বছরের পর বছর ধরে সরকারি টাকার হরিলুট। আর এ লুটপাটে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় কোনো প্রতিকারেরও চেষ্টা দেখা যায় না। অস্থায়ী এ বাঁধ যেন কোটি টাকার চিরস্থায়ী ব্যবসা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর তথা চলনবিলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমির ধান রক্ষার্থে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এর নির্মাণকাজ ১৯৮০ সালে শেষ হয়। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাঁধটির বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া অংশের শাহজাদপুরের পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা সøুইস গেটের পশ্চিম পাশে ভেঙে যায়। পাউবো সেই থেকে স্থানীয় কৃষকদের ধান রক্ষার নামে প্রতিবছর ওই স্থানে বালু দিয়ে অস্থায়ী রিং বাঁধ তৈরি করে। সাধারণত বাঁধের নির্মাণ কাজ মার্চ মাসে শুরু হয় এবং বাঁধের স্থায়িত্ব ২৮ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। নির্মাণ শেষে বাঁধ ভেঙে না গেলেও প্রতি বছর জুন মাস শেষে মাছ আহরণ ও নৌকা চালানোর সুবিধার জন্য অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বাঁধ কেটে দেন মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকেরা। এতে চোখের সামনে সরকারের কোটি টাকা জলে ভেসে যায়। আর স্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত লোকজন বাঁধের পাইলিংয়ের বাঁশ, খুঁটি ও বালুর বস্তা লুট করে বিক্রি করে।
জানা যায়, গত ৪ বছরে রাউতারা সøুইস গেটের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ অস্থায়ী রিং বাঁধ নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ বছরে এ বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। স্থানীয়দের মতে, অস্থায়ী এ বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙার কাজ চলছে চার দশক ধরে। পাউবো ও প্রশাসন কঠোর নজরদারি করলে বাঁধটি সহজেই রক্ষা করা যায়।
স্থানীয়রা জানান, বরাবরই এই রিং বাঁধ নির্মাণে নানা অনিয়ম চলে আসছে। একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ না নিয়ে বারবার অস্থায়ী বাঁধ তৈরির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা জলে ভেসে যাওয়ার মহোৎসব চলছে। বাঁধে যে পরিমাণ মাটি ও বালি ফেলার কথা, তা বাঁধে ফেলা হয় না কোনো বছরই। তাছাড়াও প্রতি বছর বাঁধটির কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ার পর বাদ-বাকি অংশটুকু থেকেই শুরু হয় আবারও বাঁধ নির্মাণ।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনাসহ চলনবিল অঞ্চলের প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই এর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ফলে আগাম বন্যার পানি ঢুকে পড়লে ধান কেটে ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি অনেক সময় ফসল কাটাই সম্ভব হয় না। তাই প্রতি বছরই রাউতারা রিং বাঁধ ঘিরে উদ্বেগে থাকেন কৃষকরা। তবে এবার পানি তুলনামূলক কম থাকায় ধান কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে পোতাজিয়া ইউপি চেয়ারম্যান (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শহিদুল ইসলাম বলেন, এখানে পাম্প হাউজসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে দুই ফসলি জমিতে বহুমাত্রিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এখানে স্থায়ী বাঁধসহ একটা পাম্প হাউজ নির্মাণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধের পাশাপাশি আধুনিক পাম্প হাউজ নির্মাণ করা হলে শুধু বন্যানিয়ন্ত্রণই নয়, দুই ফসলি জমিতে বহুমুখী ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে এলাকার কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর বন্যার পানিতে এ অঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার হেক্টর গো-চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েন খামারিরা। সিরাজগঞ্জ জেলা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং ওই রিং বাঁধের তদারকি কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহম্মেদের কাছে বালু দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার প্রাক্কলনে বালু দিয়েই বাঁধ নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে। সেই মোতাবেক টপ ৪ মিটার রেখে কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জায়গাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং কম্বাইন বা মাল্টিভেন্ট রেগুলেটরসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য বৃহত্তর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে সমস্যা আর থাকবে না।