ডেঞ্জার জোনে নৌযাত্রা ঝুঁকিতে হাজারো প্রাণ

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরার বাসিন্দাদের কাছে মেঘনা নদী এখন কেবল কোনো সাধারণ নৌপথ নয়; বরং নিত্যদিনের অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর জীবন-মৃত্যুর এক নির্মম কাহিনি। নিরাপদ যাতায়াতের একমাত্র সরকারি মাধ্যম বিআইডব্লিউটিসি (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন)-এর সি-ট্রাকটি দীর্ঘ ছয় মাস ধরে অচল। ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষ বাধ্য হয়ে ফিটনেসবিহীন ট্রলার, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ঝুঁকিপূর্ণ ছোট স্টিলবডি লঞ্চে চড়ে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন। ডেঞ্জার জোনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এই অবৈধ যাত্রী পরিবহন চললেও, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সংস্থাগুলোর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে এক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনা ও বড় ধরনের প্রাণহানি।

সম্প্রতি তজুমদ্দিন লঞ্চঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মনপুরা থেকে একটি কাঠের মালবাহী ট্রলারে শতাধিক যাত্রী ঘাটে এসে পৌঁছেছেন। ট্রলারের ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ভেতরের অংশে গাদাগাদি করে বসে আছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। কোথাও নেই বসার ন্যূনতম স্বস্তি, নেই লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া কিংবা অন্য কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম। একই ট্রলারে যাত্রীদের পাশে বহন করা হচ্ছে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং বিভিন্ন ভারী মালামাল। বিকেলে মনপুরাগামী ফিরতি ট্রলারেও একই দৃশ্য দেখা যায়।

প্রচ- গরম, বৈরী আবহাওয়া এবং উত্তাল নদীর ঢেউ উপেক্ষা করে বাধ্য হয়ে মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হচ্ছেন। কারণ বিকল্প কোনো নিরাপদ নৌযান বর্তমানে চালু নেই।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ সময় সি-সার্ভে সনদ ছাড়া কোনো নৌযানে যাত্রী পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই প্রতিদিন ট্রলার ও ছোট নৌযানে যাত্রী পরিবহন চলছে।

যাত্রীদের মুখে আতঙ্ক আর ক্ষোভ : নিয়মিত যাত্রী মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রয়োজনের তাগিদে নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করতে হয়। ট্রলারে উঠলেই মনে হয়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব তো? মাঝনদীতে ঝড় উঠলে সবাই আল্লাহর নাম নিতে থাকে। তখন নিজের জীবন নিয়েই শঙ্কা হয়।’ আরেক যাত্রী মোছা. নাসরিন আক্তার বলেন, ‘ছোট সন্তানকে নিয়ে ট্রলারে ওঠা মানেই ভয়। কিন্তু মনপুরাবাসীর সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। বাধ্য হয়েই জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হচ্ছে।’

মনপুরা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আমিনুল ইসলাম জসিম বলেন, ‘দীর্ঘ ছয় মাস ধরে মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে চলাচল করছে। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার বিষয়টি তোলা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দ্রুত একটি আধুনিক সি-ট্রাক চালু করা প্রয়োজন।’

হাজিরহাট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ‘ট্রলারের অবস্থা এবং নদীর উত্তাল ঢেউ দেখে অনেক সময় পরিবার নিয়ে যাত্রা করতেই সাহস পাই না। মনপুরার মানুষের নিরাপদ নৌযাতায়াত নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

উন্নয়নকর্মী আলী আকবর বলেন, ‘মাঝনদীতে হঠাৎ বৈরী আবহাওয়া শুরু হলে ট্রলারের ভেতরে নারী ও শিশুদের কান্নায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়েই এই ঝুঁকি নিচ্ছেন।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, সি-ট্রাক বন্ধ থাকার সুযোগে একটি অসাধু চক্র ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি চোখে পড়ছে না।

কেন বন্ধ সি-ট্রাক : ঘাটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথে চলাচলকারী বিআইডব্লিউটিসির ‘এসটি ইলিশা’ সি-ট্রাকটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। পরবর্তী সময়ে ইজারাদার পরিবর্তনের প্রক্রিয়াও শুরু হওয়ায় সেবা চালু হতে আরও বিলম্ব হয়। স্থানীয়দের দাবি, মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখানে একটি নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক সি-ট্রাকের বিকল্প নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেটি অচল থাকায় হাজারো মানুষকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, ‘মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি ডেঞ্জার জোন। সেখানে অবৈধ ট্রলার চলাচলের বিষয়টি আমাদের নজরে এলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিআইডব্লিউটিসির উপ-বাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভীর হোসেন বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ইজারা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি দীর্ঘদিন চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে। খুব শিগগিরই মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটে সি-ট্রাক পুনরায় চালু করা হবে।’ বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান বলেন, ‘আগের ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সি-ট্রাকটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। পরে ইজারা হস্তান্তর এবং যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের কারণে বিলম্ব হয়েছে। দ্রুত বিকল্প সি-ট্রাক দিয়ে এই রুটে যাত্রীসেবা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

প্রতিশ্রুতি মিললেও অপেক্ষার শেষ কবে : স্থানীয় এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি ভোলা সফরকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী দ্বীপাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত মানসম্মত নৌযান চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি। এদিকে প্রতিদিনের মতো আজও শত শত মানুষ বাধ্য হয়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলারে চড়ে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন। নিরাপদ নৌযান চালু না হওয়া পর্যন্ত মনপুরাবাসীর এই অনিশ্চয়তার যাত্রা যে থামছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত