জলাভূমি আছে বলেই প্রাণের বৈচিত্র্য আছে, বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে, পুষ্প আছে, পাখি আছে, মিঠাপানির মাছ আছে, হিজল করচ, মান্দার, তমাল, বরুম গাছ আছে, বনরাজি আছে, পানির স্তর আছে এবং প্রকৃতি টিকে আছে। নদী নাই, জলাভূমি নাই সবুজ নাই, সবুজ উদাও! যেখান দিয়ে নদী বয়ে যাবে যেখানের সবকিছুই বাঁচবে। জলাভূমি যেখানে আছে সেখানে বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকবে। বন্যপ্রাণীরা টিকে থাকবে। জলজ উদ্ভিদ টিকে থাকবে। এটাই বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্র। উচ্চফলনের আশায় কৃষিতে বাধাহীনভাবে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দেশের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের চিত্র বোঝা যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ১৯৭২ সালে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল চার হাজার টন। ১৯৮০ সালে পাঁচ হাজার টন এবং ২০০০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার টনে। এরপর মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে ২০২২ সালে বালাইনাশকের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার টনে। এই পরিসংখ্যান দেখার পর নিশ্চিত করে বলা যায়, গত চার বছরে এর ব্যবহার আরও বেড়েছে বৈ কমেনি।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে বিপন্নের পথে পরাগায়নে অতি জরুরি মৌমাছি। পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়। জলাভূমিতে কারেন্ট জাল, বেরজাল, এয়ারগান, বিষটোপ ব্যবহার করা হয়। বিষটোপ হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড, গ্যাস ট্যাবলেট, রোটেনন, ল্যাম্বডা, সাইহ্যালোথ্রিন, গ্লাইফোসেট নামক বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া হিজল করচ বন উজার, সেচ দিয়ে মাছ ধরা, পোনা মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা বিক্রি, মাটি ঘেষে জাল টানা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, উজান থেকে আসা রাসায়নিকযুক্ত পানি, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, পানিতে অক্সিজেনের অভাব, শামুক ঝিনুক নির্বিচারে আহরণ ও চুন ও মাছের ও হাঁস-মোরগের খাবার তৈরির জন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করা, জলাশয়ের নীরব বন্ধু ও বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী।
হাওর হলো জেলের পেশা, পাখির খাবার, প্রাকৃতিক জলজ খাবার, মিঠাপানির মাছ, পাখির আবাসস্থল, প্রাকৃতিক জলাধার, পরিযায়ী পাখি, জলজ পরিবহন, সেচের পানিসহ অনেক প্রাকৃতিক সম্পদের আবাসস্থল। বিষটোপ দিয়ে পাখি হত্যা করে। ছোট ছোট মাছ ও পতঙ্গের ভেতর ফুরাডান, বাসুডিন, কার্বোটাফ, গণফসফরাস, নিউনিকোটিনয়েড নামক বিষ দিয়ে ফেলে রাখে সেগুলো পাখি খেলে অজ্ঞান হয়ে যায়। এসব বিষ খুবই মারাত্মক। তা ছাড়া নাইনলের সুতার তৈরি ফাঁদ, বক ধরার জন্য কলাপাতার ঘর, ঘুঘু ধরার জন্য পিঞ্জর, গুলতি, বন্দুক, ব্যবহার করা হয়। ফসফরাস বা কার্বামেট গ্রুপের তীব্র কীটনাশক (যেমন ডায়াজিনন, ফুরাডান বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত বিষ) পানিতে ঢেলে দেওয়া হয়। এতে পানির অক্সিজেন দ্রুত কমে যায় এবং ছোট-বড় সব মাছ ও জলজ প্রাণী ভেসে ওঠে। গ্যাস ট্যাবলেট মূলত ধান বা শস্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত এই বিষাক্ত ট্যাবলেট পানিতে ফেলে মাছ অজ্ঞান বা মেরে ফেলা হয়। ছোট ফাঁসের মশারি দিয়ে হাওরের একদম তলদেশ ছেঁকে ফেলা হয়। ফলে মাছের ডিম, রেণু পোনা এবং জলজ কীটপতঙ্গ সব ধ্বংস হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে কার্বাইড ও বিস্ফোরক পটকা বা হালকা বিস্ফোরক ব্যবহার করে পানিতে শক দেওয়া হয়, যা মাছের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ নষ্ট করে দেয়।
অসচেতনতা এবং স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতাদের অতি-মুনাফার লোভে অনেক সময় সরকারিভাবে নিষিদ্ধ বা অত্যন্ত উচ্চমাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন : কার্বোফুরান, ডাইমেথোয়েট, সাইপারমেথ্রিন ইত্যাদি) জমিতে ছিটানো হয়। বর্ষার শুরুতে বা অকাল বন্যায় যখন ক্ষেতের এই বিষাক্ত পানি ধুয়ে সরাসরি হাওরের মূল জলাশয়ে গিয়ে পড়ে, তখন তা পুরো পানির গুণাগুণ নষ্ট করে ফেলে। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় এবং বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে মাইলের পর মাইল। একটি সুস্থ জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হলো ফাইটোপ্লাংকটন (অণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ), জুপ্লাংকটন (অণুবীক্ষণিক প্রাণী) এবং বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ (যেমন : কলমি, হেলেঞ্চা, শাপলা, পদ্ম ও শ্যাওলা)। হাওরের বাস্তুতন্ত্রে শামুক এবং ঝিনুকের ভূমিকা অপরিসীম। এদের বলা হয় প্রাকৃতিক ‘পানি শোধনকারী’ বা ন্যাচারাল ফিল্টার। কীটনাশকের ভারী ধাতুগুলো পানির নিচে মাটিতে জমা হয়। যেহেতু শামুক ও ঝিনুক কাদার নিচে বাস করে, তাই তারা সরাসরি এই বিষ শোষণ করে এবং গণহারে মারা যায়। এদের নীরব বিলুপ্তির কারণে হাওরের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং তলদেশের উর্বরতা নষ্ট হয়। বাস্তুতন্ত্রের একটি নিয়তি হলো কেউ একা মরে না।
কীটনাশকের ক্ষতিকর উপাদানগুলো প্রকৃতিতে সহজে নষ্ট হয় না। এটি পানি থেকে প্লাংকটন, প্লাংকটন থেকে মাছ এবং মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জৈব পরিবর্ধন বা বায়োম্যাগনিফিকেশন। হাওর শুধু পানির আধার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ, অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং প্রকৃতির এক অমূল্য আশীর্বাদ। নিষিদ্ধ ও বিষাক্ত কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে হাওরগুলো একেকটি ‘মৃত জোনে’ পরিণত হবে । প্রকৃতি তার ওপর করা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না। তাই পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে টেকসই কৃষির দিকে এগোতে হবে। হাওর বাঁচলে মাছ বাঁচবে, পাখি বাঁচবে, আর তবেই ভালো থাকবে আমাদের বাংলাদেশ। যে জন্য কীটনাশক ব্যবসা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শক্ত নজরদারি দরকার। বিষমুক্ত বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনও জরুরি। পাশাপাশি জমিতে পরিমিত সার প্রয়োগ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
লেখক : গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক