প্রকৃতি কখনো কখনো কীভাবে রুষ্ট হয় মুনষ্যসৃষ্ট কারণে, এর মর্মন্তুদ নজির আছে অনেক। ‘সিঁদুরে মেঘ দেখলে ঘরপোড়া গরু ডরায়’ এই প্রবাদটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা স্তরে স্তরে বসবাসকারীদের অবস্থাও অনেকটা এ রকমই। যারা পাহাড়ে জীবনঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন, তারা নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অর্থাভাবে কিংবা কম খরচে বসবাসের জন্য যারা ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন তারা একশ্রেণির বলবানের লোভের গ্রাসের বলি। পাহাড়ে মর্মন্তুদ ঘটনা প্রায় প্রতি বছরের নিয়মিত অধ্যায় হয়ে উঠেছে। টানা ভারী বৃষ্টিপাতে কক্সবাজার ও পেকুয়ায় পাহাড়ধসে শিশুসহ নিহতের সংখ্যা এ সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত ১১-তে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পাহাড়ধসের প্রবল আশঙ্কায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে মাইকিং করার পরপরই সৃষ্টি হলো আরও বেদনাদায়ক উপাখ্যানের।
৬ ও ৭ জুলাই দেশ রূপান্তরে পাহাড়ধসের আশঙ্কা এবং ধসের যে বার্তাগুলো উঠে এসেছে তা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একেকবার একেকটি ঘটনা ঘটছে আর প্রতিকার-প্রতিবিধানহীনতার বিষয়গুলো আমাদের সামনে এসে দাঁড় করাচ্ছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র জটাজালই স্ফীত হচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই যে হয় না কক্সবাজার ও পেকুয়ার ঘটনাটি তা-ই ফের প্রমাণ করল, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা জানি, গত কয়েক বছরে যেভাবে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এর প্রত্যেকটির পেছনে যে অনুষঙ্গ বিদ্যমান তা সংবাদমাধ্যম ও জনপরিসরে চর্বিত চর্বন। কারণগুলো চিহ্নিত সত্ত্বেও যা করলে মানুষের জীবন ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে, এর কিছুই হয়নি! আমাদের স্মরণে আছে, চট্টগ্রামের মতিঝরনায় ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ৩০টি সুপারিশ করেছিল। এরপরও এ ব্যাপারে আরও কিছু সুপারিশ ছিল। সেই সুপারিশগুলো কি বাস্তবায়িত হয়েছে? উত্তর প্রীতিকর নয়।
যেভাবে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের বৃক্ষ উজাড়, কতিপয় বলবানের বস্তি-বাণিজ্য এবং বহুমুখী অভিঘাতে ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে পাহাড়। প্রশ্ন হচ্ছে, জীবন-মৃত্যুর খতিয়ান প্রতিকার-প্রতিবিধানহীনতা আর নিয়ম ভঙ্গের কারণে আর কত দীর্ঘ হবে? আর কত প্রাণ অপরিণামদর্শিতার বলি হলে ঘুম ভাঙবে দায়িত্বশীলদের? বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড় নিয়ে আতঙ্কের কারণ একদিকে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং এই প্রেক্ষাপটে অন্যদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যাদের তাদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা বইবে তা তো হতে পারে না। পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক চরিত্র যাদের কারণে বিনষ্ট হচ্ছে তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে এই বিপর্যয়ের পথ রুদ্ধ করা দুরূহ। যারা নিরুপায় হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে বাধ্য হচ্ছেন তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন ছাড়া কেবল উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান দেবে না। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সচেতন করার জন্য প্রচারণা চালিয়েই দায় এড়ানোর অবকাশ আছে বলেও আমরা মনে করি না। আমরা এও মনে করি, সচেতনতা ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়েই প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
আইনে বলা আছে, পাহাড়ের পাদদেশে কোনো বসতি স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে বহু মানুষ বসবাস করছে। এত মর্মান্তিকতার পরও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি দিন দিন কীভাবে বেড়ে চলেছে এই প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর দিতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পাহাড়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির ক্ষেত্র স্বার্থানেষীরা বিস্তৃত করছেন এই অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সরকারকে নির্মোহ অবস্থান নেওয়ার তাগিদও আমরা দিই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, পাহাড় হলো পৃথিবীর ফুসফুস। একে ধ্বংস করা মানে মানুষের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা। বলবানদের লোভের থাবা গুটাতেই হবে, মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার প্রতিকারও করতে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর দরজা বন্ধ করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে। তা তো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।