আস্থা ডিজিটাল অর্থনীতির কার্যকর ভিত্তি

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩২ এএম

বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ও কার্যকর মুদ্রার নাম টাকা বা ডলার নয়, বরং ‘আস্থা’। একটি দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং আধুনিক কোডিং ব্যবহার করে একটি কিউআর কোড তৈরি করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত সহজসাধ্য কাজ। কিন্তু সেই একটি ক্ষুদ্র কোডের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের লেনদেন নিশ্চিত করা এবং তাদের নিরঙ্কুশ বিশ্বাস অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। বাংলা কিউআর নামক এই নতুন উদ্যোগটি সেই বিশ্বাসের পরীক্ষায় কতটা সফল হবে, তার উত্তর মূলত প্রযুক্তির উৎকর্ষের চেয়ে বেশি নির্ভর করবে সরকারের নীতিমালা, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহকসেবার ওপর।

গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে যে অসাধারণ নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তার নাম ডিজিটাল লেনদেন। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৈনন্দিন বাজার করা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন কিংবা সেমিস্টার ফি জমা দেওয়া সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। তবে এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যাও এতদিন বিদ্যমান ছিল তথাকথিত ‘কিউআর কোডের জঙ্গল’। আমাদের দেশের যেকোনো মাঝারি বা ক্ষুদ্র দোকানে ঢুকলে দেখা যেত কাউন্টারে ঝুলে থাকা হরেক রকমের কিউআর কোড কোনোটি বিকাশের, কোনোটি নগদের, কোনটি রকেটের বা দুটি-তিনটা ব্যাংকের পস মেশিন। একজন গ্রাহকের স্মার্টফোনে যে নির্দিষ্ট অ্যাপ আছে, লেনদেনের অর্থ গ্রহণকারীর সেই কিউআর কোডের ব্যবস্থা নেই অথবা ওই ব্যাংকের পস মেশিন নেই। তখন ক্রেতা মানে আপনি ওই কেনাকাটার বিল পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার সত্ত্বেও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা নির্বিঘœ ছিল না বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিদায়ক ছিল। এই আন্তঃব্যবহারযোগ্যতার অভাব ডিজিটাল অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে দিয়েছিল।

এই জটিলতা নিরসনেই বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর-এর প্রবর্তন করেছে। এটি এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে একটি মাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমেই বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, বিভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ এবং কার্ড থেকে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যেকোনো ভালো উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু প্রযুক্তির উদ্বোধন করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং টেকসই আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামোগত কিছু ঘাটতি এখনো প্রকট। প্রথমত, বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহার করেন এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে হলে একটি সচল স্মার্টফোন, সচল ইন্টারনেট সংযোগ এবং নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকিং অ্যাপ থাকা বাধ্যতামূলক।

দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোয় ইন্টারনেট সংযোগ এখনো সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির সুফল যদি আমরা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই, তবে এই ডিজিটাল বিভাজন দূর করা জরুরি। যদি দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়, তবে ‘সবার জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল লেনদেনের এই স্বপ্নটি অধরাই থেকে যাবে। দ্বিতীয়টি হলো : উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও সফলতার পথে বড় বাধাটি হলো মানসিক। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গভীর সংশয় কাজ করে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকলে ভবিষ্যতে তাদের ওপর করের বোঝা চাপানো হতে পারে কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক প্রশ্নের ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে। এই ধারণাটি সঠিক হোক বা ভুল, এই সন্দেহটি যে জনমনে বিদ্যমান, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তাই বাংলা কিউআরের পূর্ণাঙ্গ সফলতার জন্য ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন ছিল। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আশ^স্ত করা উচিত যে, তাদের লেনদেনের তথ্য কেবল সেবার মান উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং কেউ কোনো প্রকার অযথা হয়রানি বা গোপনীয়তা ভঙ্গের শিকার হবেন না। তথ্যের কঠোর নিরাপত্তা এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এমনকি জনগণ এই ব্যবস্থায় আসতে আগ্রহী হবেন না। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ হারানোর আশঙ্কার অন্যতম বড় কারণ হলো উচ্চমূল্যের সার্ভিস চার্জ। বর্তমানে বিভিন্ন এমএফএস এবং ব্যাংকের লেনদেনের খরচ একেক রকমের : হাজারে ৫ টাকা থেকে শুরু করে ১৪ টাকা পর্যন্ত, শোনা যাচ্ছে এর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা সেবা চার্য ধার্য করা হবে। কোনো একীভূত কিউআর ব্যবস্থায় যদি একেক প্রতিষ্ঠানের জন্য একেক হারে অর্থ কাটা হয়, তবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবে এবং এই অভিন্ন ব্যবস্থার মূল আবেদনটি নষ্ট হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি স্বচ্ছ, সহজবোধ্য এবং সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য ইউনিফাইড নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, প্রয়োজনে ভবিষ্যৎ সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দিতে হবে, যা গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়কেই লেনদেনে উৎসাহিত করবে।

ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভীতি কাজ করে লেনদেন ব্যর্থ হওয়া নিয়ে। বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীর কাছে তা পৌঁছায়নি। আবার উল্টোটিও ঘটে ব্যবসায়ী টাকা পেলেও গ্রাহকের অ্যাপে লেনদেন ‘ব্যর্থ’ দেখাচ্ছে। এ ধরনের ঝুলে থাকা লেনদেনগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের চরম অনীহা তৈরি করে। আমাদের দেশে প্রচলিত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে কোনো অভিযোগ করলে সমাধান পেতে গ্রাহককে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। কারও অভিযোগ হয়তো দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত কিউআর কোডের ব্যবহার-বিধিতে এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ : আপনি বিকাশের অ্যাপ ব্যবহার করে কাউকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করলেন, কিন্তু আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেওয়া হলেও ব্যবসায়ী পাননি এই মুহূর্তে আপনার অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আপনাকে বিকাশের কাছেই ধরনা দিতে হবে।

এ রকম পরিস্থিতিতে কখনো পড়েছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কি মধুর? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। বাংলা কিউআরের মতো জাতীয় একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই এই সমস্যার দ্রুত সমাধানে একটি কার্যকর ও সময় সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ব্যর্থ লেনদেনের প্রতিকার পেতে গ্রাহক যেন এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে না ছোটে, সেই দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকেই নিতে হবে। একটি স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি কেন্দ্র অথবা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন : ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা) অভিযোগের চূড়ান্ত সমাধান নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। যখন একজন সাধারণ মানুষ জানবেন যে, তার টাকা কোথাও হারিয়ে যাবে না এবং সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে, তখনই তিনি নির্ভয়ে বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে শুরু করবেন।

বাংলা কিউআরের সফল বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাদের জন্য একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। এই ব্যবস্থা ব্যবহারে তাদের ব্যবসায়িক সুবিধা কী হবে, লেনদেনের খরচ কত কম হবে এবং তাদের অ্যাকাউন্টে কত দ্রুত টাকা জমা হবে এই বিষয়গুলো জনসমক্ষে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দিতে ছোট দোকানদার বাংলা ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা কর ছাড়ের মতো সুবিধা দেওয়া যায় কি না, তা-ও বিবেচনা করা উচিত। এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং তদারকির জন্য কী ধরনের নীতিমালা থাকবে, তা সবার কাছে উন্মুক্ত ও স্পষ্ট হতে হবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত টুল নয়, বরং এটি আমাদের অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের একটি প্রতীক। তবে প্রযুক্তি তখনই সার্থক হয়, যখন মানুষ সেটিকে আপন করে নেয়। সেই আপন করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় বিশ্বাস থেকে। একটি সুদৃঢ় নীতিমালা, কার্যকর ও কঠোর তদারকি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এই আস্থা অর্জন সম্ভব। যদি এই বিষয়গুলোকে প্রযুক্তির সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবেই বাংলা কিউআর বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির এক অপরাজেয় ভিত্তিতে পরিণত হবে। আমরা কেবল একটি নতুন পেমেন্ট সিস্টেম চাই না, আমরা চাই একটি নিরাপদ ও আস্থাশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ। বাংলা কিউআর  নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।

লেখক : প্রযুক্তিবিদ। অধ্যাপক, আইআইটি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত