কী আছে ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনীতে!

‘খালা মনি’ খ্যাত গানের জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান অনেকদিন ধরেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ঠিকমতো গুছিয়ে কথাও বলতে পারে না। তবে এই অসুস্থতার মাঝেই নিজের আত্মজীবনী লিখে ফেলেছেন তিনি। বইটির নাম দেয়া হয়েছে ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’। 

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি, কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপাসহ সংগীত ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। 

নিজের জনপ্রিয় গান ‘লোকে বলে প্রেম’-এর চরণ থেকেই আত্মজীবনীর নাম রেখেছেন ফেরদৌসী রহমান। বইয়ের নামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সংগীতের প্রতি ভালোবাসাই তার কাছে ‘প্রেম’, আর সেই ভালোবাসাকে ধরে রাখতে যে নিরন্তর সাধনা, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেটিই তার কাছে ‘জ্বালা’। 

ফেরদৌসী রহমান বলেন, 'নিজে বিশেষ কোনো কাজ করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে বইটিতে অনেক মানুষের কথা, অনেক ঘটনার কথা লিখেছি। বিশেষ করে পুরনো ঢাকার পরিবেশ, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নানা আচার-অনুষ্ঠান, খাবার, জীবনযাপন এসব বিষয় পাঠক জানতে পারবেন।' 

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শিল্পীর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন তার দীর্ঘদিনের সহশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। তিনি জানান, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাদের পরিচয়। পরে ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার দ্বৈত কণ্ঠ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তিনি বলেন, 'পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের কন্যা হওয়ায় ফেরদৌসী রহমান ছোটবেলা থেকেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞদের সান্নিধ্য পেয়েছেন, যা তার শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।' 

কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ফেরদৌসী রহমানকে বাংলা সংগীতের ‘হিমালয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, 'আধুনিক গান, নজরুলসংগীত, ধ্রুপদী ও পল্লীগীতিসহ সব ধারার সংগীতে তার সমান দক্ষতা উপমহাদেশে বিরল।' 

১৯৪১ সালের ২৮ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। বাবা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছেই সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। ১৯৪৭ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে তার কণ্ঠে প্রথম গান প্রচারিত হয়। দেশভাগের পর পরিবারসহ ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। 

১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ষাট ও সত্তরের দশকে প্রায় ২৫০টি চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশন করেন তিনি। পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশে বাংলা গান পরিবেশন করে দেশের সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছেন। 

বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’র মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছেও ‘খালা মনি’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান এই শিল্পী। ১৯৭৭ সালে সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং চুরুলিয়া নজরুল স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।