হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে দেশটির অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই দেশ কুয়েত ও বাহরাইনের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ৮৫টি পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন ‘আমি যতদূর জানি, এটা (যুদ্ধবিরতি) শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে দরকষাকষি করা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।’ একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বকে ‘জঘন্য, অসুস্থ, ও সহিংস প্রকৃতির লোক বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমাদের অসামান্য মধ্যস্থতাকারীরা যদি (তাদের সঙ্গে) আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে আমি এতে আপত্তি করব না। তবে আমি এখানে সাফল্যের সম্ভাবনা দেখি না। আমি এসব মানুষকে (ইরানিদের) পছন্দ করি না। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি নৌযান। অন্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা এবং জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। জবাব দিতে বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)।
আইআরজিসি বলেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর (ফিফথ ফ্লিট) ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনে গতকাল সকালে দুই দফায় সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাসিন্দাদের নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে জলে যাওয়ার আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় দফায় সাইরেন বাজার ঘটনার পর ইরানি সেনাবাহিনী জানায়, তারা বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতও ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। আইআরজিসির দাবি ইরানের বিভিন্ন স্থানে ওয়াশিংটনের হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করা হয়েছে, এটি ছিল তারই ‘প্রথম ধাপের পাল্টা জবাব’। আইআরজিসি আরও বলেছে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতার সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতার মতো ‘ঐতিহাসিক ঘটনাকে’ আড়াল করা বা এর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া।
এদিকে, ইসলামাবাদে সমঝোতা চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়েছেন ইরানের শীর্ষ মুখপাত্র এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক বার্তায় সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করেছেন তিনি। গালিবাফ বলেন, ‘লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা, দক্ষিণ ইরানে হামলা চালানো এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। এই চুক্তি একপ্রকার ব্যর্থ। ধমক এবং জবরদস্তির দিন শেষ। এতে কোনো লাভ হবে না। আমরা নতি স্বীকার করব না।’
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। ১৪ ধারার এই চুক্তিতে উল্লেখ ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ তুলে নেবে ইরান এবং বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের ওপর থেকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং ইরানি বন্দরগুলো থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিন এই ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে বলেও উল্লেখ ছিল সেখানে। এরই মধ্যে ইরানের তেল বিক্রির ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির অধীনে, গত ২২ জুন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ একটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছিল। এর আওতায় আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি শেষের ঘোষণার পরই বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে এবং শেয়ার বাজারে বড় পতন দেখা দিয়েছে; গত ২৫ জুনের পর জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭২ ডলার ছাড়িয়ে যায়।