বোস্টনের আকাশে সূর্য ডোবার আগে ফুটবলবিশ্বের চোখ ফিরে যাবে চার বছর আগের এক রাতে। কাতারের সেই রাত, যেখানে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। থিও হার্নান্দেজ আর কোলো মুয়ানির পায়ে সেদিন স্বপ্নভঙ্গ হয় আটলাস সিংহদের। ২-০ গোলে জিতে ফাইনালের টিকিট কাটে ফ্রান্স। কিন্তু সেই হারেও মরক্কো প্রমাণ করে, তারা নিছক আবেগের গল্প নয়; বিশ্বের সেরাদের চোখে চোখ রেখে লড়ার সাহস আছে তাদের। চার বছর পর দুই প্রতিপক্ষ আবার মুখোমুখি। এবার কি পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি প্রতিশোধ নেবে মরক্কো?
ইতিহাসের পাতা উল্টালে অবশ্য পাল্লাটা ফ্রান্সের দিকেই ঝুঁকে। ছয়বারের দেখায় চারবারই জিতেছেন ফরাসিরা। মরক্কোর ঝুলিতে জয় মাত্র একটি, সেটিও টাইব্রেকারে। বাকি একটি ম্যাচ ড্রয়ে শেষ হয়। সর্বশেষ দেখা সেই কাতারের সেমিফাইনালেই। কিন্তু পরিসংখ্যান যা-ই বলুক, বর্তমান মরক্কো সেই ইতিহাস উল্টে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস নিয়েই কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নামবে। এই বিশ্বকাপে এতদিন ফ্রান্সের পরীক্ষা হয়েছে আক্রমণের ধার আর মানসিক দৃঢ়তার। কিন্তু মরক্কোর সামনে দিদিয়ের দেশমের দলকে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা দিতে হবে। আফ্রিকার এ প্রতিনিধিরা রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি বল পায়ে রেখে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতেও বেশ দক্ষ। ফলে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের সামনে এমন এক দল, যারা প্রয়োজনে ম্যাচের ছন্দ থামিয়ে দিতে পারে, আবার চোখের পলকে পাল্টা আক্রমণে গেঁথে দিতে পারে বিষদাঁত।
চার বছর আগের সঙ্গে বর্তমান মরক্কোর বিস্তর ফারাক। তখন তারা ছিল বিস্ময়কর আন্ডারডগ, যাদের নিয়ে ফুটবলবিশ্বের তেমন প্রত্যাশা ছিল না। এবার আশরাফ হাকিমিরা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়েই উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছে। ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড আর হাইতির মতো প্রতিপক্ষকে সামলে গ্রুপপর্বে ৭ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত থেকে নকআউটে উঠে মরক্কো। এরপর শেষ ষোলোয় অন্যতম আয়োজক দেশ কানাডাকে তাদের ঘরের মাঠে একরকম উড়িয়ে দেয়। ৩-০ গোলের সেই জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দেশটির পরিকল্পিত ফুটবলের ছক।
মরক্কোকে নিয়ে যথেষ্ট সমীহ ঝরেছে ফ্রান্সের সহকারী কোচ গি স্তেফাঁর কণ্ঠে, ‘আমরা সদ্য যে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছি, মরক্কো হবে তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষ। তারা খুবই সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল দল। রক্ষণভাগে দৃঢ়তা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তারা দারুণ কার্যকর এবং এভাবেই অনেক গোল করেছে। ডান ও বাঁ- দুই প্রান্তেই তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। নিঃসন্দেহে তারা একটি মানসম্পন্ন দল।’
এদিকে সর্বশেষ দুটি বিশ্বকাপেই ফাইনালে খেলা ফ্রান্স এবারও দাপুটে শুরু পায়। তবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পেতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ঘাম ছুটে যায় ফরাসিদের। পেনাল্টি থেকে পাওয়া এমবাপ্পের একমাত্র গোল বাঁচিয়ে দেয় তাদের মান। তবু ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এখনো এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এমবাপ্পের সঙ্গে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিস আর ব্র্যাডলি বারকোলা এই চারজনের গতি এবং কৌশল যেকোনো রক্ষণকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মরক্কোও এমন এক দল, যারা মাঝমাঠে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে জানে, আবার উইং দিয়ে বিদ্যুৎগতির পাল্টা আক্রমণে গোলের সুযোগ বের করতে পারে। মুখোমুখি লড়াইয়ের আগে দুই শিবিরেই দুশ্চিন্তার মেঘ। ফরাসি মিডফিল্ডার অরেলিয়ান চুয়ামেনি এখনো চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ হননি। মরক্কো হয়তো পাবে না তাদের গুরুত্বপূর্ণ ফরোয়ার্ড ইসমাইল সাইবারিকে।
এই ম্যাচে এমবাপ্পে-হাকিমিদের ছাড়িয়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসা দিয়োপ। মরক্কোর এ সেন্টারব্যাককে একসময় দলে পেতে আগ্রহ দেখায় আফ্রিকার দুটি দেশ। তবে তিনি ফ্রান্সের হয়ে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে এবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তার দায়িত্ব এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের আক্রমণ ভেস্তেদেওয়া। ২৯ বছর বয়সী দিয়োপের বাবা সেনেগালের এবং মা মরক্কোর হলেও তার জন্ম ফ্রান্সের তুলুজ শহরে। তার দাদা ছিলেন সেনেগাল জাতীয় দলের কোচ। তবু দিয়োপের লক্ষ্য ছিল শুধু ফ্রান্সের হয়ে খেলা। এমনকি দেশটির অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও খেলেছেন তিনি। তখন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ফরাসি। আমার জন্ম ফ্রান্সে। ফ্রান্স আমাকে সবকিছু দিয়েছে। শুধু ফ্রান্সের মূল দলে সুযোগ না পাওয়ার কারণে অন্য কোনো জাতীয় দলে যোগ দেওয়া আমার জন্য কিছুটা ভণ্ডামির মতো হতো।’
কিন্তু ভাগ্য ঘুরে গেছে অদ্ভুতভাবে। গত মার্চে মরক্কোর জার্সিতে অভিষেকের পর এখন তিনিই দলের রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ। শেষ ৩২-এর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যোগ করা সময়ে সমতাসূচক গোল করে যেন সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন একাই। পরে টাইব্রেকারে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে মরক্কো। এবার ফ্রান্সের আক্রমণ থামাতে দিয়োপের দিকেই তাকিয়ে থাকবেন তাদের সমর্থকরা। তাদের লক্ষ্য ফ্রান্সকে হারিয়ে গতবারের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া। ফ্রান্সও চাইবে মরক্কো-বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে।