অর্থাভাবে লোডশেডিং লাগামহীন

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৩ এএম

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সরল হিসেবে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন ক্ষমতা বেশি রয়েছে ১১ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে লোডশেডিং কেন হচ্ছে?

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর পেছনে মূল কারণ অর্থ সংকট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একদিকে উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে বকেয়া বিল পরিশোধ করছে না, অন্যদিকে তেল কেনার টাকাও দিচ্ছে না। এতে ঘুরছে না বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাকা।

জুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সে সময় কমিশন জানায়, দাম বাড়ানোর  পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিপুল এই অর্থের জোগান দিতে পিডিবি হিমশিম খাচ্ছে। পিডিবির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত সময়ে ভর্তুকির অর্থ ছাড় না করায় তারা বিল পরিশোধ করতে পারছেন না। এখানে তাদের কোনো দায় নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসরকারি উদ্যোগেদের অন্তত ছয় মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি কোম্পানিগুলোর ১৮ মাসের বিল বকেয়া রেখেছে পিডিবি। কখনো অনুরোধ করে, কখনো হুমকি দিয়ে বিল আদায় করছেন উৎপাদনকারীরা। বিদ্যুতের সংকট নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বেড়ে চলছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ শুধু রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে না, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসও ভাঙচুর করেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল চলার সময় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে হুমকিও দিচ্ছেন সাধারণ গ্রাহক। কোথাও কোথাও এসব বিষয় থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের দাবিতে এভাবে মানুষকে রাস্তায় নামতে দেখা যায়নি। সরকারও পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বিদ্যুৎ নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, আমরা সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে বলা হয়েছে, যাতে দেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কোনো ঘটনা ঘটলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।’

জ্বালানি সংকট বাড়ছে : দেশে সব মিলিয়ে ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৬৬টির পাশে লেখা রয়েছে ‘ফুয়েল শর্টেজ’ বা জ্বালানি সংকট। এনএলডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল তরল জ্বালানি নয়, গ্যাস ও কয়লারও সংকট রয়েছে। এতে চাহিদামাফিক উৎপাদন করা যাচ্ছে না। লোডশেডিংয়ের কোনো বিকল্প থাকছে না।

সরকারি একটি কোম্পানির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্থ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছর থেকেই উৎপাদনকারীদের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়তে শুরু করে। তখন কয়লা আমদানির টাকা না থাকায় বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। একই অবস্থা ছিল তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর। অন্তর্বর্তী সরকারও এই অবস্থার মধ্যেই ছিল। কোনো উৎপাদনকারীর পাওনা ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও তাকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে জমতে জমতে এখন অনেক টাকা হয়ে গেছে, যা একবারে সরকারের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার যদি চিন্তা করে, তার কাছে সব মিলিয়ে যে টাকা বকেয়া রয়েছে তা পাঁচ কিংবা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করবে, তাহলে চলতি মাসের বিলের সঙ্গে একটি বকেয়া বিলও দিতে হবে। কিন্তু সরকার তো চলতি মাসের বিলই পরিশোধ করছে না। আবার তেল কেনার টাকাও দেয় না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র চালানোর বিষয়ে উদ্যোক্তারা আগ্রহী নন।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র বন্ধ রাখলে পিডিবির পক্ষ থেকে চালানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তেল কিনলে পিডিবি কেবল বিদ্যুতের দাম দেয়, ঋণের সুদ তো দেয় না। তাহলে কোম্পানিগুলো কীভাবে চলবে?’

বঞ্চনা বেশি গ্রামে : বিদ্যুৎ বিতরণে সরকারের একটি অঘোষিত নীতি রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে প্রথমে রাজধানী ঢাকার চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর বিভাগীয় শহর, ক্রমান্বয়ে জেলা ও উপজেলা সদর এবং ইউনিয়ন সদর দপ্তরে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। সবশেষে গ্রামের কথা চিন্তা করা হয়।

এই বণ্টননীতি নতুন না হলেও সরকার কখনোই তা প্রকাশ্যে আনে না। সব জায়গায় বিদ্যুতের দাম এক হলেও গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই বিভক্তি অনেক আগে থেকেই বহাল রাখা হয়েছে। এজন্য ঢাকায় এক মিনিটের লোডশেডিং না হলেও গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ বঞ্চিত হচ্ছে। এই বঞ্চনা যেমন আওয়ামী লীগের সময় ছিল, তেমনি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও টিকে ছিল। এখনো তা রয়ে গেছে।

দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৫৮ শতাংশ বিদ্যুৎ বিতরণ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ রাজস্ব এবং ভ্যাট আদায়ের ৫৮ শতাংশ আসে গ্রাম থেকে। বাকি ৪২ শতাংশ আসে শহর থেকে।

আরইবির হিসাব বলছে, গড়ে এক-তৃতীয়াংশের মতো লোডশেডিং হয় আরইবি এলাকায়। চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আরইবির সমিতিগুলোর পিক ডিমান্ড বা সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াট। ওই সময়ে আরইবিতে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল ২৩ শতাংশ।

বরাবরই দেখা যায়, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে গ্রামে লোডশেডিং বেশি করা হয়। গত জুনের শেষ দিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোতে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করা হয়েছে। জানতে চাইলে আরইবির সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গরমের তীব্রতা বাড়লে আমাদের লোডশেডিংও বাড়ে। জুনের শেষ দিকে এসে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এখন কমে তা এক হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।’

সহসা উন্নতির আশা নেই : গত ফেব্রুয়ারিতে জানানো হয়েছিল, বিদ্যুৎ বিল বাবদ বকেয়ার পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। তবে পিডিবি জুন ক্লোজিংয়ের পর নতুন করে নতুন হিসাব প্রকাশ করেনি। সংস্থার সদস্য (অর্থ) অঞ্জনা খান মজলিশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বকেয়া থাকে। এখনো তেমনই থাকতে পারে।’

পিডিবির অর্থ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা জানান, এখনো বকেয়ার পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকার মতো, যা সাড়ে চার মাসের বিদ্যুৎ বিলের সমান।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন, খুবই কঠিন।’ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় পিডিবি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি তারা দেয়নি।’

তবে বিদ্যুতের ভর্তুকি না কমালে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত