বিশ্বকাপ শেষ ষোলোর ম্যাচে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা প্রত্যাবর্তনের অবিশ্বাস্য গল্প লিখে মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। যে লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করেছিলেন, তিনিই ৪ মিনিটের এক ঝড়ে রোমেরোকে দিয়ে গোল করান এবং নিজে গোল করে সমতা ফেরান খেলায়। পরে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে জয় ছিনিয়ে নেন মিসরের কাছ থেকে।
কিন্তু এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে ম্যাচ জেতার পরও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হচ্ছে আজেন্টিনাকে ফরাসি রেফারির কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে। একটি ছিল মোস্তফা জিকোর করা গোল ভিএআর দেখে বাতিল। যে গোলের শুরুটা হয়েছিল একটি ফাউল দিয়ে। আরেকটি ছিল আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল, যেটির শুরু হয়েছিল মোহামেদ সালাহকে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে ফেলার পর। দুটিতেই আর্জেন্টিনা সুবিধা পেয়েছে বলে দাবি মিসরের। মাঠেই মিসরের কোচ হোসাম হাসান রেফারির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। পরে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চেয়ে সবদিক থেকে ভালো খেলেছি। কিন্তু ম্যাচের ফল মাঠের ভেতরের এবং মাঠের বাইরের কিছু বাহ্যিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সম্ভবত তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। সম্ভবত তারা চেয়েছিল লিওনেল মেসি এ দৌড়ে থাকুক।’ হোসাম হাসান ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা মাঠে কোনো সম্মান বা ফেয়ার প্লে দেখিনি। মোহামেদ সালাহকে ফাউল করার পরও আমাদের একটি পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। এমনকি ভিএআরে চেকও করা হয়নি। অন্যদিকে আমাদের দ্বিতীয় গোলটি অত্যন্ত অদ্ভুতভাবে বাতিল করা হলো।’
কাউন্টার অ্যাটক থেকে দুবার গোল করা মোস্তফা জিকো রেফারিকে ‘জালিম’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, ‘এটি একটি পাতানো ম্যাচ ছিল। এখানে আমাদের কোনো দোষ ছিল না। ওই রেফারি, দেখে মনে হচ্ছিল এই ম্যাচটি আগে থেকেই ফিক্সড করা। শুরু থেকেই তিনি আমাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছেন, তিনি চাননি আমরা জিতি। আর্জেন্টিনা যদি কেবল নিজেদের যোগ্যতায় জিতত, তবে আমাদের অনুভূতি অন্যরকম হতো।’
মিসরের সুপারস্টার ও অধিনায়ক মোহামেদ সালাহ বলেন, ‘ম্যাচটার ভাগ্য আল্লাহই নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমরা এগিয়ে গিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি। আর রেফারিং কেমন হয়েছে, সবাই দেখেছে এ নিয়ে বাড়তি বলার কিছুই নেই।’ পরে মিসরীয় ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। এবং ফরাসি রেফারিকে আর কোনো ম্যাচে না রাখার কথা বলেছে।
মিসরের এমন প্রতিক্রিয়ার পর অনেক বিশেষজ্ঞও রেফারিংয়ের সমালোচনা করেছেন। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার মিসরের বাতিল হওয়া গোল এবং পরবর্তী সময় পেনাল্টি না পাওয়ার অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে ইঙ্গিত করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন ‘হয় দুটোই ফাউল ছিল, না হলে একটাও ফাউল ছিল না। কিন্তু তারা তো আমাদের বলেছিল যে, তারা মাঠে এসে নতুন করে রেফারির ভূমিকা পালন করবে না।’
রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ ও বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ট্যাকটিশিয়ান হোসে মরিনহো এ রেফারিংকে সরাসরি ‘দিনেদুপুরে ডাকাতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর্জেন্টিনার প্রতিটি মুভমেন্ট বা ঘটনা যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হয়েছে, সেই তুলনায় মিসর কেন একই রকম সুবিধা পেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দ্য স্পেশাল ওয়ানখ্যাত কোচ, ‘আপনি যখন এই আর্জেন্টিনা দলের বিপক্ষে খেলবেন, তখন ২-০ গোলে এগিয়ে থাকাও যথেষ্ট নয়। কারণ আপনি মাঠে শুধু ১১ খেলোয়াড়ের বিপক্ষে লড়ছেন না। আপনাকে লড়তে হচ্ছে রেফারির বাঁশির বিরুদ্ধে, লড়তে হচ্ছে ভিএআর রুমের বিরুদ্ধে। এমনকি আপনাকে লড়তে হচ্ছে পুরো টুর্নামেন্টের লিখে রাখা স্ক্রিপ্টের বিরুদ্ধে।’
ফুটবল অঙ্গনের বাইরে থেকেও এ বিতর্কে যোগ দিয়েছেন দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গ্যারি কাসপারভ। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন ‘মিসরের একটি অবিশ্বাস্য গোল বাতিল করে দেওয়া হলো অনেক দূরবর্তী এক ফাউলের অজুহাতে। অথচ এর ঠিক কয়েক মিনিট পর একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও আর্জেন্টিনার গোলটি কিন্তু বাতিল করা হলো না।’ ফিফা তাদের টুর্নামেন্টের বড় বড় তারকাদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য পক্ষপাতিত্ব করছে অভিযোগ তুলে কাসপারভ বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থাকে একটি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত তামাশা’ বলে কঠোর সমালোচনা করেন।
ইংল্যান্ডের সাবেক খেলোয়াড় ও ফুটবল বিশ্লেষক ইয়ান রাইট বলেছেন, ‘যদি আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বক্সের প্রান্তে ফাউলের জন্য আগের ঘটনা টেনে এনে গোল বাতিল করতে পারেন, তবে সালাহর ঘটনার জন্যও আপনাকে আগের ঘটনা টেনে দেখতে হবে। তাকে আঘাত করা হয়েছে। আমরা যা-ই বলি না কেন, আঘাতটি হয়তো সামান্য ছিল, কিন্তু তাকে আঘাত করা হয়েছে এবং এরপরই তারা মাঠের অপর প্রান্তে চলে যায় (গোল করে)।’
লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার জেমি ক্যারাঘার ভিএআরের হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমি বলতে পারি এটি যদি অন্য কোনো দলের বিরুদ্ধে হতো, তবে এটিকে (মিসরের গোল) গোল হিসেবেই গণ্য করা হতো। এটি যদি প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা বা সিরিআয়ে হতো, তবে ভিএআর পর্যালোচনার পরও এটি গোলই থাকত। শেষ দিকে এসে এই টুর্নামেন্টে প্রচুর অধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।’
তবে এ বিতর্ক ও সমালোচনার মাঝে ইংল্যান্ডের সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস ইএসপিনকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কেন মিসরের জিকোর গোল বাতিল করা হয়েছিল, কেন মোহামেদ সালাহর পক্ষে ফাউল না দিয়ে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ফরাসি রেফারি।
মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল : ৫৮ মিনিটে ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো কাউন্টার অ্যাটক থেকে অসাধারণ এক গোল করে মিসরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল করা হয়। কারণ গোল হওয়ার আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন। ভিএআর বিশ্লেষণে দেখতে পাওয়া যায়, আত্তিয়া একই সময়ে লিসান্দ্রোর জার্সি ধরে টানেন এবং তার ডান পায়ের ওপর পা রাখেন (বল ছিল লিসান্দোর বাম পায়ে)। এ দুটি ঘটনাই ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়। আত্তিয়ার স্পষ্ট ফাউলের কারণে আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হারায়। সেই ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবেই মিসর গোলটি করেছিল। ঘটনাটি আর্জেন্টিনার ডেঞ্জার বক্সের অনেক বাইরে, মিসরের অর্ধে ঘটেছিল বলে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একই আক্রমণ পর্বে যদি কোনো ফাউলের সরাসরি পরিণতিতে গোল হয়, তাহলে সেই গোল বাতিল করতে হয়। রেফারিকে যখন একসঙ্গে জার্সি টানা ও পায়ে পা রাখার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন তার পক্ষে আগের সিদ্ধান্ত (গোল) বহাল রাখা সম্ভব ছিল না বলে মনে করেন অ্যান্ডি ডেভিস।
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে কেন ফাউল ধরা হয়নি : ম্যাচের শেষ দিকে মিসর দুটি আলাদা ঘটনায় ফাউলের আবেদন জানায়। এর একটি ঘটে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করার আগে। দুটি ঘটনাই আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ঘটে। প্রথম ঘটনায় আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারকে মিসরের হামদি ফাতির জার্সি টানতে দেখা যায়। এরপর ফাতি মাটিতে পড়ে যান। তবে রেফারি কোনো ফাউল দেননি।
আরেক ঘটনায়, ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে মোহামেদ সালাহ দাবি করেন, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেজ তাকে ফাউল করেছেন। কিন্তু রেফারির মতে, এটি ফাউল দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল না। ভিএআর দুটি ঘটনাই পরীক্ষা করে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি।
ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির জন্য ম্যাচটি বেশ কঠিন ছিল। বিশেষ করে ম্যাক আলিস্টারের ঘটনাটি মাঠের যে জায়গায় ঘটেছিল, তার ফলে এক অদ্ভুত ‘দ্বিমুখী পরিস্থিতির’ তৈরি হয়। সেখানে রেফারি কোনো সিদ্ধান্ত বদলালে তার প্রভাব একসঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে পড়ত।
প্রথমত আর্জেন্টিনার গোলটি বাতিল হতে পারত। দ্বিতীয়ত ঠিক তার আগের মুহূর্তেই মাঠের অপর প্রান্তে ফাউল হওয়ার কারণে প্রতিপক্ষ দল একটি পেনাল্টি পেয়ে যেতে পারত। কারণ দুটি ঘটনাই খেলার একই পর্যায় বা সিকোয়েন্সের মধ্যে ঘটেছিল।
তবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের (এ ক্ষেত্রে ম্যাক আলিস্টার ও আলভারেজ) আচরণ ও খেলার ধরন বিশ্লেষণ করে ভিএআর নিশ্চিত হয় যে, কোনো সিদ্ধান্তেই হস্তক্ষেপ করার মতো বড় কোনো ভুল হয়নি। তাই তারা দুটি ঘটনাই পরীক্ষা করে রেফারির আগের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন। সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক মনে করেন অ্যান্ড ডেভিস। ওই ঘটনায় সালাহ ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন। আলভারেজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লাগে এবং দুজনের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।
অনেকে শেষের ঘটনাটির সঙ্গে মিসরের বাতিল হওয়া গোলের আগে আত্তিয়ার ফাউলের তুলনা করতে পারেন। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রথম ঘটনায় একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। কিন্তু সালাহর ঘটনায় দুজনের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা দুই খেলোয়াড়ের গতির ফল। তাই দুটি ঘটনা এক নয়।