বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা আর তার সংস্কৃতিজীবন নিয়ে বাঁচা যেকোনো প্রবাসীই দেশের সম্পদ। আমাদের অর্জিত সম্পদ বা টাকা-পয়সার পাশাপাশি মেধা বিনিময় গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। সেটা হয় না। কারণ মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠেনি। সে সমাজ এখনো আশার ক্ষীণ আলো হয়ে জ্বলছে। কিন্তু মেধাভিত্তিক সমাজের যেকোনো বিকল্প নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই সমাজ গঠনের উর্বর ভূমি চাই সবার আগে।
আমরা জানি, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী আয়ের অর্থ দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে। একটি বিস্মৃত কাঠামোতে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির অভিবাসনের বিভিন্ন দিককে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে সময়ের পালাবদলের হাত ধরে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের একটি গঠনমূলক পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে হয়। বর্তমানে আমাদের মোট প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসী এসব শ্রমিক যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন, তা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেক। বিগত চল্লিশ বছরে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী বিদেশে গমন করেছে এবং তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্থ নিয়মিত পাঠিয়ে তারা এ দেশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন।
দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের বিরাট অবদান স্মরণে রাখতেই হবে এবং আবারও বলি, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ স্বাধীনতা-সংগ্রামে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে প্রবাসীরা বিরাট অবদান রাখেন। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের বিরাট অবদান রয়েছে। প্রবাসীরা আমাদের শুধু মুক্তিযুদ্ধেই নয়, অন্য সংস্কৃতিক আন্দোলনেও অবদান রেখেছেন। যখনই দেশে অগণত্রান্ত্রিক শাসন চেপে বসেছে তখনই প্রবাসীরা গণতন্ত্রের পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ জানান। জনমত সৃষ্টি করেন। এটা দেশের জন্য বিরাট শক্তি।
আমরা যারা বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত তাদের কেউ কেউ দ্বৈত নাগরিকত্বে অন্য দেশেরও নাগরিক, তাদের কষ্ট বোঝেন না অনেকেই। দুঃখ বা বেদনাগুলো দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার প্রবাসী বাঙালিদের কষ্ট ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমজীবী বাঙালির কষ্ট এক নয়। এখানে একটা বড় তফাত হলো পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি বা নাগরিকত্ব। যারা বিদেশে থাকতে পারবেন না বা সব সময়ের জন্য বিদেশে বসবাস করতে পারবেন না, তাদের সমস্যা মৌলিক। তারা দেশে টাকা পাঠান নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে বাঁচার জন্য। এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালরা। রেমিট্যান্স পাঠানোর কাজটিতে কী কী বাধা বা কোথায় এর অন্তরায়, কী কী বিদ্যমান তা সচেতনরা জানেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এর দায় কাদের বা সমাধান করবে কে? তবে অতীতের চেয়ে এখন এই পথটি অনেকটা সুগম হলেও একেবারে নিষ্কণ্টক হয়নি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা। আমার বলতে আমি আমার কথা বলছি না। সাধারণ প্রবাসীদের বেলায় পদ-পদবি পুরস্কার কিংবা অর্জনের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত আমাদের দেশের কোনো কোনো নীতিনির্ধারক । এই কুণ্ঠার কারণ আমরা জানি। কারণ তাদের বেশিরভাগই দেখতে বড় হলেও মূলত তারা বড় কেউই না। নানা গোঁজামিলে তাদের বড় করে তোলা এবং তাদের হাতে পাওয়ার থাকায় দেশের আজ এই অবস্থা। এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছা সব জায়গায় যে ভোগান্তি তার হিসাব রাখেন না রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্বশীলই। রাখলে সমস্যার গভীরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকত, যা এ পর্যন্ত খুব একটা দেখিনি। যাদের অর্জন সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে কিছুতেই ঠেকানো যায় না কেবল তখনই তাদের স্বীকৃতি মেলে। মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দেশের অন্য যেকোনো খাতের মতো প্রবাসীকল্যাণ খাতও প্রশ্নমুক্ত নয়। তাদের সদিচ্ছা থাকলেও উদ্যোগ দেখা যায় না। কিছু গৎবাঁধা পরিসংখ্যান বা তালিকা দিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, আন্তরিকতার প্রমাণ হয় না। আমরা ঢাকায় বা দেশের অন্য বিমানবন্দরে গিয়ে যেসব অনভিপ্রেত প্রশ্নের সম্মুখীন হই বা বিপত্তির মুখোমুখি হই, এর উত্তর বা সমাধান জানা দরকার। যেমন ধরুন, আপনি কেন দেশে এসেছেন? এই প্রশ্ন দিয়ে শুরুটা যেকোনো নাগরিক বা বাংলাদেশির জন্য অমর্যাদাকর। এর সঙ্গে আছে সন্দেহ আর সংশয়। একবার ভাবুন যে মানুষটি এত দেয় এবং আরও দিতে এসেছেন তাকেই নাজেহাল করা হয়!
ভাবি নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় আমাদের চেয়ে এগিয়ে। তারা যখন দেখে বা দেখবে একজন প্রবাসী ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান বা নেপালি ভিআইপি মর্যাদা পান তাদের দেশে তারা গর্ব নিয়ে অবাধে চলাফেরা করতে পারেন তখন কি তাদের মনে প্রশ্ন জাগবে না? সাধারণ মানুষ প্রবাসীদের বরণ করতে এবং তাদের ভালোবাসা দিতে কার্পণ্য করেন না। যত দোষ ওই নন্দঘোষ সিস্টেমে। এ ব্যাপারে আমাদের দূতাবাসগুলোর ব্যাপক ভূমিকা থাকার কথা কিন্তু তা কতটা হয়? যদি তা থাকেও তবে ছিটেফোঁটা। দেশের স্বার্থে অভিঘাত লাগে এমনটি কারোরই করা উচিত নয়। মত-পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশটা সবার।
মনে রাখতে হবে, দেশের বাইরে প্রায় দুই কোটিরও বেশি বাংলাদেশির বসবাস। তারা সচ্ছল ও আন্তরিক। তাদের কর্ম, তাদের মেধা ও অর্থের সঠিক মূল্যায়ন না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। দায়িত্বশীল প্রত্যেকটি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছাতে হবে, প্রবাসীরা দেশের শক্তি। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা বাঞ্ছনীয়। তাদের মর্যাদা দিতে হবে। এই শক্তির সঠিক ব্যবহারেই ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ এবং মসৃণ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : সিডনি প্রবাসী।
dasguptaajoy@hotmail.com