শাসকদের প্রতি নবীজির চিঠি

৬২৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস। হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পন্ন হয়েছে। ইসলাম দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। নবীজি (সা.) বিশ্বের প্রভাবশালী শাসকদের কাছে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সেই অনুযায়ী চিঠি পাঠান। প্রতিটি চিঠিতে ছিল ইসলাম গ্রহণের আহ্বান এবং শান্তির বার্তা। কেউ সেই আহ্বান শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। কেউ কৌতূহল নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। আবার কেউ অহংকারে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। শাসকদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। এসব পত্র ধর্মীয় দাওয়াতের দলিল এবং নবীজি (সা.)-এর দূরদর্শিতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিশ্বজনীন মিশনের উজ্জ্বল সাক্ষ্যও বহন করে। বিশ্বের প্রভাবশালী শাসকদের কাছে নবীজির (সা.)-এর পক্ষ থেকে পাঠানো কয়েকটি চিঠি উল্লেখ করা হলো।

পারস্য সম্রাট : নবীজি (সা.) পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.)-এর মাধ্যমে ওহি-সংবলিত চিঠি পাঠান। চিঠির শুরুতে ‘আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে’ লেখা দেখে অহংকারী খসরু রাগে ফেটে পড়ে। সে অত্যন্ত ধৃষ্টতার সঙ্গে চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলে। এই ধৃষ্টতার খবর পেয়ে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যেন তার সাম্রাজ্যকেও এভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেন।’ এর কয়েক দিনের মধ্যেই খসরুর নিজ পুত্র শিরওয়া তাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে এবং পরবর্তী সময়ে পারস্যের অধীন ইয়ামেনের প্রশাসক বাজান সপরিবার ইসলাম গ্রহণ করেন। (ফাতহুল বারি৮/১২৭-১২৮)

রোম সম্রাট : রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত চিঠিটি ছিল সমকালীন কূটনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সাহাবি দিহইয়া কালবি (রা.) যখন এই চিঠি নিয়ে যান, তখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) দরবারে ডেকে নবীজি (সা.) সম্পর্কে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আবু সুফিয়ানের উত্তরে নবুয়তের সত্যতা আঁচ করতে পেরে রোম সম্রাট মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি যদি তার কাছে পৌঁছাতে পারতাম, তবে তার পা ধুয়ে দিতাম।’ হিরাক্লিয়াস ক্ষমতার মোহ এবং আমলাদের বিরোধিতার কারণে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ না করলেও নবীজি (সা.)-এর দূতের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। (সহিহ বুখারি ৭)

ইথিওপিয়ার সম্রাট : ইথিওপিয়া তথা হাবশার সম্রাট নাজাশির নাম ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। মক্কা যুগে যখন মুসলিমরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তার চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে একদল সাহাবিকে হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন। তখন নাজাশির উদ্দেশে পাঠানো পত্রে নবীজি (সা.) অনুরোধ করেন, মুহাজিরদের যেন আশ্রয় দেওয়া হয় এবং তাদের প্রতি কোনো জবরদস্তি না করা হয়। পরবর্তী সময়ে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর নাজাশিকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়, যাতে মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও ঈসা (আ.)-এর প্রকৃত পরিচয় উল্লেখ ছিল। সেখানে বলা হয়, ‘ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন। অন্যথায় আপনার জাতির পাপের ভার আপনার ওপর বর্তাবে।’

নবীজি (সা.)-এর পক্ষ থেকে চিঠি পৌঁছে দেন সাহাবি আমর ইবনে উমাইয়া জামরি (রা.)। নাজাশি শ্রদ্ধার সঙ্গে চিঠিটি গ্রহণ করে নিজের চোখে ছোঁয়ান। উত্তরে তিনি নবীজি (সা.)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সিংহাসন থেকে নেমে জাফর (রা.)-এর হাতে ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করেন। (জাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৩/৬০-৬১)

মিসরের সম্রাট : মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ জুরাইজ ইবনে মাত্তার কাছে হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-এর মাধ্যমে তিনি একটি চিঠি পাঠানো হয়। বাদশাহর উপাধি ছিল মোকাওকিস। চিঠির ভাষ্য ছিল, ‘আল্লাহর বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে কিবতিদের সম্রাট মোকাওকিস সমীপে। তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, যে হেদায়েতের পথে চলে। আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর বিমুখ হলে কিবতিদের পাপের বোঝাও আপনার কাঁধে বর্তাবে।’

উত্তরে মোকাওকিস লিখেছিলেন, ‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর প্রতি কিবতি সম্রাট মোকাওকিসের পক্ষ থেকে। আপনার চিঠি আমার হস্তগত হয়েছে এবং আপনার দাওয়াত আমি বুঝতে পেরেছি। আমি জানতাম একজন নবী আসা বাকি ছিল, তবে আমার ধারণা ছিল তিনি শামে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতকে সম্মান জানিয়েছি এবং উপহারস্বরূপ দুজন সম্মানী দাসী (মারিয়া ও সিরিন), কিছু পোশাক এবং একটি খচ্চর (দুলদুল) পাঠাচ্ছি।’

মোকাওকিস ইসলাম গ্রহণ না করলেও নবীজি (সা.)-এর চিঠির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং চিঠিটি হাতির দাঁতের তৈরি একটি কৌটায় সংরক্ষণ করেন। দাসী মারিয়া (রা.)-কে নবীজি নিজের কাছে রাখেন, যার গর্ভে নবীজির পুত্র ইব্রাহিম জন্ম নেন। (রাসুলে আকরাম কি সিয়াসি জিন্দেগি ১৪১)

দামেস্কের সম্রাট : দামেস্কের সম্রাট হারিস গাসসানির কাছে ঐতিহাসিক পত্রটি বহন করেন শুজা ইবনে ওয়াহাব (রা.)। হারিস অত্যন্ত ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে চিৎকার করে বলেছিল, ‘কার সাধ্য আছে আমার থেকে আমার রাজত্ব ছিনিয়ে নেয়?’ (মুহাজারাতু তারিখিল উমামিল ইসলামিয়া ১/১৪৬)

বাহরাইনের সম্রাট : নবীজি (সা.) বাহরাইনের শাসক মুনজিরের কাছে আলা ইবনুল হাজরামি (রা.)-এর মাধ্যমে চিঠি পাঠান। মুনজির সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার ভূখণ্ডের ইহুদি ও অগ্নিপূজারিদের জন্য জিজয়া করের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা বহাল রাখার নববি নির্দেশনা লাভ করেন। (জাদুল মাআদ ৩/৬১-৬২) বিশ্বের প্রভাবশালী শাসকদের কাছে নবীজি (সা.)-এর চিঠি পাঠানোর এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইসলাম মক্কা-মদিনার বাইরেও বিস্তৃত হতে শুরু করে। ইসলামের বিস্তৃতি আজও চলমান।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক