সন্তানকে ইসলামি আদর্শে গড়ার উপায়

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

সন্তান পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। বাবা-মা যেমন সন্তানের শারীরিক সুস্থতা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তেমনি তার ইমান ও নৈতিকতা গড়ে তোলাও তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ একজন সন্তানের প্রকৃত সফলতা তার ইমান, চরিত্র ও আল্লাহভীতি সম্পন্ন জীবনের মধ্যেই নিহিত। সুন্দর পরিবেশ, ছোট ছোট অভ্যাস এবং বাবা-মায়ের সচেতন জীবনযাপনই সন্তানের ইমান গঠনের মূল ভিত্তি।

অনেকেই মনে করেন, সন্তানকে ইসলামি আদর্শে গড়ে তুলতে হলে শুধু তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সন্তানের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা শুরু হয় তার নিজের ঘর থেকেই। ঘরের পরিবেশ, বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা ও জীবনযাপনের ধরন সন্তানের মন ও বিশ্বাস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানের ইমান গঠনে কিছু সহজ ও কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ঘরের ভাষায় আল্লাহর কথা জারি রাখা : শিশুরা প্রথমে ভাষা শেখে, তারপর বিশ্বাস শেখে। তারা যা শুনে-দেখে, ধীরে ধীরে সেটাই তাদের চিন্তা ও বিশ্বাসের অংশ হয়ে যায়। তাই পরিবারের দৈনন্দিন কথাবার্তায় যদি আল্লাহর নাম ও স্মরণ থাকে, তাহলে সন্তানও স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহকে তার জীবনের অংশ হিসেবে চিনতে শিখবে। যেমন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছেন?’ তখন আপনি যদি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি,’ তাহলে সন্তান বুঝতে শিখবে, ভালো থাকার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। আবার কোনো কাজের পরিকল্পনা করলে যদি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমরা কাল এটা করব,’ তাহলে সন্তান বুঝবে, ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

সন্তান কোনো ভালো কাজ করলে যদি তাকে বলেন, ‘মাশাআল্লাহ তুমি খুব ভালো করেছ,’ তাহলে তার মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা তৈরি হবে। এই ছোট ছোট শব্দগুলো শুধু কথার অলংকার নয়, এগুলো ইমানি সংস্কৃতিরও অংশ। যখন সন্তান দেখবে আল্লাহ আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত, তখন তার কাছেও আল্লাহ বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন।

নামাজকে শান্তির মাধ্যম বানানো : নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু শিশুর কাছে নামাজকে কঠোর শাসন বা শাস্তির মতো মনে হলে সে নামাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। তাই সন্তানের কাছে নামাজকে ভালোবাসা, শান্তি এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার একটি সুন্দর মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা জরুরি। শিশুকে বলুন, ‘চলো আমরা দুজন মিলে আল্লাহর সঙ্গে একটু কথা বলি।’ এভাবে নামাজকে একটি আন্তরিক সম্পর্কের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করলে শিশুর মনে আগ্রহ তৈরি হবে। কোনো প্রয়োজন বা ইচ্ছা থাকলে তাকে বলুন, ‘চলো আল্লাহর কাছে দোয়া করি।’ এতে সে বুঝবে, আল্লাহ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়।

গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া : শিশুরা যুক্তি বা দীর্ঘ উপদেশের চেয়ে গল্প বেশি সহজে মনে রাখতে পারে। তাই সন্তানের হৃদয়ে ইমান ও নৈতিকতার বীজ বপন করতে গল্প অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। নবীদের জীবনের ঘটনা, সাহাবিদের ত্যাগ ও ইমানের গল্প, সত্যবাদিতা ও ধৈর্যের গল্প শিশুদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

রাতে ঘুমানোর আগে পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় নিয়ে সন্তানকে গল্প শোনানো একটি সুন্দর অভ্যাস হতে পারে। যেমন ইব্রাহিম (আ.)-এর তাওয়াক্কুল, ইউসুফ (আ.)-এর ধৈর্য কিংবা সাহাবিদের সত্যবাদিতা ও সাহসিকতার গল্প। এসব গল্প শুনে শিশুর মনে আল্লাহর ওপর ভরসা, সততা ও ধৈর্যের শিক্ষা জন্ম নেয়। গল্পের মাধ্যমে দেওয়া শিক্ষা শিশুর মনে দীর্ঘদিন থাকে এবং ধীরে ধীরে তা তার চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে।

নিজের আমল ঠিক করা : প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হলো নিজের জীবনকে সংশোধন করা। কারণ সন্তান বাবা-মায়ের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি দেখে এবং অনুসরণ করে। যদি বাবা-মা নিজেরাই মিথ্যা বলেন, তাহলে সন্তানকে সত্যবাদিতা শেখানো কঠিন হয়ে যায়। যদি তারা নামাজে অবহেলা করেন, তাহলে সন্তানের কাছেও নামাজ গুরুত্ব হারায়। আবার যদি তারা কোরআন তেলাওয়াত না করেন, তাহলে সন্তানও কোরআনের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। অন্যদিকে যদি সন্তান দেখে তার বাবা-মা নিয়মিত নামাজ পড়েন, কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং আল্লাহর স্মরণে জীবন কাটান, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ অনুসরণ করতে শিখবে। তাই সন্তানের ইমান গঠনের প্রথম ধাপ হলো নিজের জীবনকে আল্লাহভীতির পথে পরিচালিত করা। আপনি বদলালে ঘরের পরিবেশ বদলাবে, আর পরিবেশ বদলালে সন্তানও ধীরে ধীরে বদলে যাবে।

সন্তানের জন্য দোয়া করা : মানুষ যত চেষ্টা করুক না কেন, প্রকৃত হেদায়েত একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই সন্তানের ইমান ও সঠিক পথের জন্য নিয়মিত দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজের পরে, তাহাজ্জুদের সময় বা একান্ত মুহূর্তে সন্তানের জন্য দোয়া করা উচিত। যেমন বলা যায়, ‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে ইমানদার বানান। তাকে সৎ ও নেককার বানান। তাকে আপনার প্রিয় বানান।’ মা-বাবার আন্তরিক দোয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বাবা-মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনকে বদলে দিয়েছে।

সন্তানের ইমান গড়ে তোলার কাজটি কঠিন মনে হলেও আসলে এটি ছোট ছোট নিয়মিত প্রচেষ্টার ফল। প্রতিদিন একটু করে চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে ইমান, নৈতিকতা ও আল্লাহর ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। আজ একটি দোয়া শেখানো, কাল একটি গল্প বলা, পরশু একসঙ্গে দুই রাকাত নামাজ পড়া, এভাবেই ধীরে ধীরে একটি শিশুর হৃদয়ে ইমানের আলো জ্বলে ওঠে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত