মতভেদেও বজায় থাকুক শিষ্টাচার

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এতে ইবাদত, আচার-আচরণ, সমাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ সবকিছুরই সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে ইসলামের অনেক শাখাগত (ইজতিহাদি) বিষয়ে যুগে যুগে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে। ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এটি একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত বাস্তবতা। কারণ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে গবেষণা, ইজতিহাদ ও গভীর চিন্তাভাবনার ফলে কখনো কখনো ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই মতভেদ কখনো যেন শত্রুতা, বিদ্বেষ কিংবা বিভেদের কারণ না হয়, এটাই ইসলামের শিক্ষা।

মতভেদ আর বিভেদ এক বিষয় নয়। মতভেদ হতে পারে জ্ঞান ও গবেষণার স্বাভাবিক ফল, কিন্তু বিভেদ হলো হৃদয়ের দূরত্ব, পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, সাহাবায়ে কেরাম বহু বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তবুও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না।

একটি বিখ্যাত ঘটনা হলো, রাসুল (সা.) একবার সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইজায় পৌঁছানোর আগে আসরের নামাজ আদায় না করে।’ পথিমধ্যে আসরের সময় হয়ে গেলে একদল সাহাবি নবীজির কথার আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে নামাজ বিলম্বিত করেন। অন্যদল মনে করেন, রাসুল (সা.) দ্রুত পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন, নামাজ বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে বলেননি। তাই তারা সময়মতো নামাজ আদায় করেন। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে উপস্থাপিত হলে তিনি কোনো দলকেই ভর্ৎসনা করেননি। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আন্তরিক ইজতিহাদের (গবেষণা) ভিত্তিতে মতভেদ হলে তা গ্রহণযোগ্য।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), ইসলামের এই চার মহান ইমাম মধ্যেও বহু ইজতিহাদি মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু তারা একে অপরের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে আলেমদের মতভেদকে কেন্দ্র করে অনেক সাধারণ মানুষ এমন আচরণ করেন, যা ইসলামি আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেউ প্রিয় আলেমের সমর্থনে অন্য আলেমদের হেয়প্রতিপন্ন করেন, আবার কেউ বিরোধিতার নামে কটূক্তি, বিদ্রুপ ও গালমন্দে লিপ্ত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অথচ আলেমদের ভুল থাকলে তা শালীন ভাষায় দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করা যায়। কিন্তু তাদের সম্মানহানি করা কখনোই বৈধ নয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলো।’ (সুরা বাকারা ৮৩) এই আয়াতে সব মানুষের সঙ্গে সুন্দর ও ভদ্র আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আলেমদের সঙ্গে তো অবশ্যই আরও বেশি সম্মান ও শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে। কারণ তারা দ্বীনের জ্ঞান বহনকারী এবং উম্মাহর পথপ্রদর্শক। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। (সুরা হুজুরাত ১১)

আলেমদের মতভেদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি, দল বা আলেমকে ভালোবাসি বলেই তার সব কথা নির্ভুল মনে করা যেমন ভুল, তেমনি অপছন্দ করি বলেই তার সব কথা বাতিল মনে করাও অন্যায়। ইসলামের শিক্ষা হলো ব্যক্তিকে নয়, বক্তব্যকে যাচাই করো। আবেগকে নয়, দলিলকে প্রাধান্য দাও।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮)

এই আয়াত ইসলামের ন্যায়বিচারের এক চিরন্তন নীতি ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ভালোবাসা বা ঘৃণা, কোনোটিই যেন মানুষকে ন্যায় ও সত্য থেকে বিচ্যুত না করে। একজন মুমিনের পরিচয় হলো, সে বন্ধুর ক্ষেত্রেও ন্যায় করে, শত্রুর ক্ষেত্রেও ন্যায় করে।

বর্তমান সময়ে উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। ঐক্য মানে এই নয় যে, সবাইকে একই মত গ্রহণ করতে হবে। বরং ঐক্য হলো, মতভেদ থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা এবং ইসলামের মৌলিক আদর্শে একত্র থাকা।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত