বাংলার বিবি

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাংলাদেশের দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের অকুতোভয় কাণ্ডারি বিবি রাসেল। ১৯৫০ সালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহর চট্টগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম হয়। তার পিতা মোখলেসুর রহমান এবং মা শামসুন নাহার। শৈশবেই তিনি পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন এবং কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুলজীবন শেষ করেন। পরবর্তী সময় আজিমপুরের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তিনি নিজের ভেতরের সুপ্ত সৃজনশীলতাকে ডানা মেলার সুযোগ দেন। ফ্যাশন ডিজাইনিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা থেকে তিনি পাড়ি জমান সুদূর যুক্তরাজ্যে এবং ১৯৭৫ সালে লন্ডনের বিখ্যাত ‘লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন’ থেকে ফ্যাশন বিষয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক শেষ করার পর আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতে বিবি রাসেলের এক বর্ণিল ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয়। তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং গ্ল্যামারের কারণে তিনি দ্রুতই বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিন ভোগ, কসমোপলিটান এবং হার্পারস বাজারের শীর্ষ মডেল হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেন। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ দুই দশক তিনি ইভ সেন লরেন্ট, কেনজো, কার্ল ল্যাগারফেল্ড এবং জর্জিও আরমানির মতো বিশ্বসেরা ও কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক র‌্যাম্পে প্রথম সারির মডেল হিসেবে সফলতার সঙ্গে কাজ করেন।

বিশ্বের গ্ল্যামার জগতের চূড়ায় অবস্থান করার পরও নিজের শেকড় এবং দেশের মাটির টান তাকে তাড়া করে বেড়াত। ফলস্বরূপ, ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক রকম সমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি পাকাপক্ষীয়ভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এ দেশে এসে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিবি প্রোডাকশনস’। এই ফ্যাশন হাউজের মূল লক্ষ্যই ছিল অবহেলিত দেশীয় তাঁত, বুনন শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাদিকে আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে ফিউশন করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাওয়া। তার এই দূরদর্শী উদ্যোগ শুধু ফ্যাশনেই পরিবর্তন আনেনি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ২০০৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তার এই বিবি প্রোডাকশনসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের প্রায় ৩৫,০০০ গ্রামীণ তাঁতি যুক্ত ছিলেন এবং স্বাবলম্বী হয়ে উঠছিলেন।

ইউনেস্কোর বিশেষ সহায়তায় ১৯৯৬ সালে তিনি প্যারিসে একক ফ্যাশন শো আয়োজন করেন, যা ছিল কোনো দক্ষিণ এশীয় নারীর জন্য প্রথম এবং যুগান্তকারী একটি ঘটনা। এরপর ১৯৯৭ সালে স্পেনে ‘দ্য কালারস অব বাংলাদেশ’ নামক আরও একটি সফল ফ্যাশন শোর আয়োজন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে তার এই অনন্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ স্পেনের রাজার কাছ থেকে তিনি ‘ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’ উপাধিতে ভূষিত হন। ইউনেস্কো তাকে ১৯৯৯ সালে ‘ডিজাইনার ফর ডেভেলপমেন্ট’ এবং ২০০১ সালে ‘আর্টিস্ট ফর পিস’ উপাধিতে ভূষিত করে। এ ছাড়া ২০০৪ সালে তিনি স্পেনের জাতিসংঘ অ্যাসোসিয়েশন থেকে ‘পিস প্রাইজ’ লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির একজন সম্মানিত ফেলো। ফ্যাশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের পোশাক পরিকল্পনাতেও তিনি নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন এবং ২০০৯ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।