আজ ২৩ জুন লেখক, সমাজ বিশ্লেষক, চিন্তক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৯১তম জন্মদিন। এ জন্মদিন উপলক্ষে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে জীবন ও কর্ম নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সাহাদাত পারভেজ ও মামুন রশীদ। কথপোকথনে উঠে এসেছে বরেণ্য এই ব্যক্তিত্বের জীবনের নানা গল্প। নিজের লেখালেখি, সম্পাদনা নিয়ে তিনি যেমন কথা বলেছেন, তেমনি নিজের সময় নিয়ে করেছেন আলোকপাত; সীমা ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে দীর্ঘ জীবনের হিসাবও মিলিয়েছেন
দেশ রূপান্তর : স্যার, ৯১তম জন্মদিন উপলক্ষে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। জীবনের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনার নানা রকমের অভিজ্ঞতা আছে। আপনি দেশ-জাতির অনেক অধ্যায়ের সাক্ষী। এই সময়ে এসে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমার এই সীমিত জীবনকালে আমি তিনটি রাষ্ট্র দেখলাম। আমার জন্ম ব্রিটিশ রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক শাসনামলে। পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাসিন্দা হলাম। এরপরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। এর মধ্যে আমি যেটা দেখলাম ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রের ভেতরে অন্তর্গতভাবে, চরিত্রগতভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ ওপরের দিকে পরিবর্তন হয়েছে। বড় রাষ্ট্র ব্রিটিশের, ছোট রাষ্ট্র পাকিস্তানে, তার চেয়েও ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশে। এই যে রাষ্ট্র বদল, এর সঙ্গে সঙ্গে শাসকরাও বদল হয়ে গেল। কিন্তু জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কটার কোনো বদল হলো না। রাষ্ট্র আগের মতোই রয়ে গেল।
আমাদের দারিদ্র্যের বড় কারণ এই সম্পদ পাচার। সম্পদ শ্রমজীবী মানুষ তৈরি করে। দেশে শ্রমের মাধ্যমে, বিদেশে শ্রমের মাধ্যমে। কিন্তু শ্রমের মাধ্যমে তৈরি সেই সম্পদ দেশের ভেতর থাকছে না। এর বড় একটা অংশ চলে বিদেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে দেখলাম, মেধা পাচারও বেড়েছে। মেধা পাচার ব্রিটিশ আমলে এতটা হতো না। তখন যারা বিদেশে যেতেন তারা লেখাপড়া শেষ করে দেশে চলে আসতেন। পাকিস্তান আমলে আমরাও বিদেশে গেছি লেখাপড়া করতে। পড়ালেখা শেষে ফেরত চলে এসেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে যেটা ঘটল, বিদেশে প্রচুর মেধাবী মানুষ গেছে। তাদের ধরে রাখার যে ব্যবস্থা দেশের ভেতর সেটা নেই, ফলে তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেননি।
রাজনীতিতেও এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ব্রিটিশ আমলে শাসন করত ব্রিটিশ আমলারা। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি বুর্জোয়ারা আর বাংলাদেশে বাংলাদেশি বুর্জোয়ারা। রাষ্ট্রের এই যে চরিত্র বদল হচ্ছে, সেটা আসলে পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক শাসনের বদল। শাসকরা বদল হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো বদল হয়নি। রাজনীতিতে বদলটা এই রকমের হলো যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তারপরে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন আর বাংলাদেশ হওয়ার পরে বাংলাদেশের যে সরকারগুলো এসেছে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন। এতে যে পরিবর্তনটা হলো, তাতে শুধু শাসকশ্রেণির মানুষগুলোর পরিবর্তন হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন, সে আন্দোলন পাকিস্তান আমলে যখন শুরু হয় সেটা ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। কিন্তু তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান ছিল। আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে চলে এলাম।
এর আগে ১৯৪৬ সালে কী ঘটল? ৪৫ সালের শেষ দিকে সমগ্র ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলায় একটা প্রায় বৈপ্লবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। স্পষ্ট হচ্ছিল যে, অভ্যুত্থান ঘটবে বা ব্রিটিশরা চলে যাবে এবং বামপন্থিরা ক্ষমতায় আসতে পারে। ৪৬ সালে নির্বাচন দেওয়া হলো। সেই নির্বাচনে কী হলো? নির্বাচনে হিন্দুরা হিন্দু সম্প্রদায়কে আর মুসলমানরা মুসলমান সম্প্রদায়কে ভোট দিয়েছে। পরিণামে দেশভাগ হলো। দেশভাগের আগে ভীষণ রকমের দাঙ্গা হলো। ফলে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ওই যে সমাজ পরিবর্তনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল সেটা নষ্ট হয়ে গেল। তারপরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরে যে একটা বিপ্লবী সম্ভাবনা গড়ে উঠছিল ৫৪ সালে নির্বাচন দিয়ে সেটাকেও স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো। যুক্তফ্রন্টের মধ্যে ভাগ-বিভাজন দেখা গেল। তারপরে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলে এলো। সেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান, সেই অভ্যুত্থানও কিন্তু জাতীয়তাবাদীই ছিল। তখন জাতীয়তাবাদী মূল শক্তি ছিল আওয়ামী লীগ। আবার বামপন্থিরাও ছিল। সমাজতন্ত্রীরাও ছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা তখন বিভক্ত হয়ে গেছে। সময় গড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আবারও এই দেশের শাসন ক্ষমতা চলে গেল উঠতি বাঙালি বুর্জোয়াদের হাতে। স্বাধীনতার পর অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে গেছে কিন্তু আমরা উন্নতি করতে পারলাম না।
দেশ রূপান্তর : একানব্বই বছর মহাকালের হিসেবে খুব বেশি না। কিন্তু মানুষের আয়ু হিসেবে অনেক। আপনি একানব্বই বছর যাপন করলেন এই পৃথিবীটিতে। লেখালিখি করলেন সমাজ পরিবর্তনের জন্য। লেখালেখিটা শুরু করলেন কবে? কোন তাগিদে লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সেই তাগিদটা কোনো সুস্পষ্ট তাগিদ না। একটা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার এই লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহটা বাড়ল। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন ফুটবল খেলতে গিয়ে আমার পা ভেঙে গেল। প্রায় দেড় মাস পা প্লাস্টার করা ছিল। প্লাস্টার খোলার পরেও আমি ভালোভাবে হাঁটতে পারছিলাম না। আমরা তখন রাজশাহীতে থাকতাম। রাজশাহীতে একটা ভালো পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। ওই সময়ে আব্বা লাইব্রেরি থেকে কিশোরদের উপোযোগী বই এনে দিতেন। বাড়িতে তখন শিশুসাথী, আজাদ, মোহাম্মদী পত্রিকা আসত। সেগুলো আমি পড়তাম। ওই সময়ে ঘরে শুয়ে-বসে বই পড়েই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগটা বাড়ল। পরে দেখলাম বই পড়াটাই আমার বিনোদন হয়ে উঠল। ওই সময় আজাদ পত্রিকায় মুকুলের মাহফিল ছিল, সেখানে আমার বয়সী ছেলেরা মেয়েরা লিখছে। আমি ভাবলাম, তাহলে আমি লিখি না কেন? সেখান থেকেই আমার লেখার আগ্রহটা তৈরি হলো। এরপরে আমি হাতে লেখা পত্রিকা, দেয়াল পত্রিকা এগুলোর ভেতর দিয়ে গিয়েছি। মোহাম্মদী পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়, সেটি মোপাসাঁর গল্পের অনুবাদ। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। এভাবে আস্তে আস্তে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়তে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে আব্বা চেয়েছিলেন আমি অর্থনীতি পড়ি। কিন্তু আমার আগ্রহ সাহিত্যে। এই নিয়ে বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। একসময় বাবা বললেন, তাহলে তুমি ইংরেজি সাহিত্যে পড়ো। বাবা আশা করছিলেন যে আমি সিভিল সার্ভিসে যাব। ওইটাই তখনকার লক্ষ্য ছিল। আমি সিভিল সার্ভিসে যাইনি এর কারণ হলো সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে গেলাম। বাবা এটা মেনে নিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার বড় আকর্ষণ ছিল গ্রন্থাগার। দ্বিতীয়ত ছাত্রদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ। তৃতীয়ত, যারা আমার শিক্ষক ছিলেন তাদের সান্নিধ্যলাভ। এইসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা শুরু করি। এখনো এখানেই আছি।
দেশ রূপান্তর : ছেলেবেলায় কি ভেবেছিলেন শিক্ষক হবেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, শিক্ষক হওয়ার কথা কখনো ভাবিনি। লেখালেখির এক পর্যায়ে সময় নামে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতে লাগলাম। পত্রিকা সম্পাদনায় আমার যে অভিজ্ঞতাটা হলো, তা আমাকে আনন্দ দিত। শিক্ষকতাও আমাকে আনন্দ দিয়েছে। আবার সাহিত্যের চর্চায়ও আনন্দ পেয়েছি। কাজেই আমি কেবল শিক্ষকই না, সাহিত্য চর্চাও করি। এই দুটোই আমার পরিচয়। আমি বলি আমার দুটো সত্তা লেখক ও শিক্ষক। এ দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। দুটোই পরিপূরক পরিচয় আমার জন্য।
দেশ রূপান্তর : লেখালেখির শুরুর কথা জানলাম। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : প্রথমে একটা বই বেরুলো, ছোট্ট বই। আহমদ পাবলিশিং হাউস বলে এক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল। একশ মনীষীকে নিয়ে তারা একটা জীবনী সিরিজ বের করবে। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার। আবু যোহা নূর আহমদ ছিলেন লাইব্রেরির সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি বললেন, আপনি তো লেখালেখি করেন, শেক্সপিয়ারের একটা জীবনীগ্রন্থ লিখে দিন। তখন ৬৪ পৃষ্ঠা মানে চার ফর্মার ওই সিরিজে ছোটদের শেক্সপিয়ার বইটি প্রকাশ পায়। এটাই আমার প্রথম বই। দ্বিতীয় বই হচ্ছে অন্বেষণ। সেটা বেরোয় ১৯৬২ সালে। তারপরে ধারাবাহিকভাবে বই বের হয়েছে, হচ্ছে। মাঝখানে কিছুদিন ইংল্যান্ডে ছিলাম। তখন বই লিখতে পারিনি। তবে আমি মনে করি, আমার প্রথম বই অন্বেষণ। বইটির নামও আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তখন আমার মনে হয়েছিল আমি অন্বেষণেই আছি। তখনো পথের সন্ধান পাইনি।
দেশ রূপান্তর : বৃত্ত ভাঙার একটা পরিকল্পনা নিয়ে আপনার লেখালেখি এগিয়েছে। জীবনের এই পর্বে এসে বৃত্ত ভাঙার কাজটা কতটুকু এগিয়েছে বলে মনে করেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, বৃত্ত ভাঙতে পারিনি। বরং আমি ওই বৃত্তের মধ্যেই আছি এবং বৃত্তটা আরও কঠিন, আরও সংকীর্ণ হয়েছে। কেননা পুঁজিবাদ এখন চরম ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করেছে। পৃথিবীতে যুদ্ধ নেই, মহাযুদ্ধ নেই; কিন্তু ছোট ছোট যুদ্ধ চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও জানেন তিনি কতটা হাস্যকর। কিন্তু তার লজ্জা-শরম নেই। তিনি সারা পৃথিবীকে আতঙ্কে রেখেছেন। ইরানে যুদ্ধের যে ক্ষয়ক্ষতি তাতে আট কোটি মানুষের খাদ্যসংস্থান হতো। যুদ্ধের নামে এখন নির্বিচারে শিশুহত্যা হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের যত খবর আসছে, সেটা আগে কখনো শোনা যায়নি। মানুষের দারিদ্র্য বাড়ছে, নিঃসঙ্গতা বাড়ছে, আত্মহত্যা বাড়ছে। বাবা-মা দেশে পড়ে আছেন বা নিঃসঙ্গ অবস্থায় আছেন, সন্তানরা বিদেশে আছে এটা বিত্তবান পরিবারে ঘটছে আবার মধ্যবিত্ত বা বিত্তহীন পরিবারেও ঘটছে। এক্ষেত্রে যারা বিত্তহীন তাদের তো অবর্ণনীয় দুঃখ। আবাসন নেই, কর্মের সংস্থান নেই। পুঁজিবাদ এই বৈষম্য সৃষ্টি করছে, দারিদ্র্য সৃষ্টি করছে, বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করছে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এখন পৃথিবীজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারাই কর্তৃত্ব করছে। আমাদের দেশে, বিদেশে সর্বত্রই এই সংকট, যে সংকটটা আমরা দেখলাম কিন্তু ভাঙল না পৃথিবী। অথচ ভাঙার সম্ভাবনা ছিল। ১৯১৭ সালে যে রুশ বিপ্লব হলো, সেই বিপ্লব একটা পথ দেখিয়েছিল। তারপরে অনেক জায়গায় বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদের যে দৌরাত্ম্য, পুঁজিবাদের যে কৌশল, পুঁজিবাদ একদিকে আকর্ষণ করে মানুষকে সুযোগ দেয়, আরেক দিকে নিপীড়ন করে। এই আকর্ষণ এবং নিপীড়নের মধ্য দিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে ছাড় দিয়ে ও অন্যদিকে অত্যাচার করে পুঁজিবাদ টিকে আছে। এখন সম্পদ একজনের হাতে বাকি নিরানব্বই জন নিঃস্ব। ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব মানুষ আরও গরিব হচ্ছে। এই যে বৃত্ত এটা ভাঙা সম্ভব হয়নি।
দেশ রূপান্তর : সংবাদে আপনার লেখা নিয়মিত ছাপা হতো ‘গাছপাথর’ নামে। ওই সময়টায় বেশিরভাগ লেখকই ছদ্মনামে লিখতেন। আপনি কেন ‘গাছপাথর’ নামটা সিলেক্ট করলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ছদ্মনামের প্রতি আমার আকর্ষণ দুই কারণে। চার্লস ল্যাম নামে একজন ইংরেজ লেখকের আমি খুব ভক্ত ছিলাম। তিনি ছদ্মনামে লিখতেন। ছদ্মনামে লেখার সুবিধা আছে। একটা হচ্ছে, আমি অনেক বেশি স্বাধীনতা পাই। আরেকটা হচ্ছে, পরিচিত লোকদেরও সমালোচনা করতে পারি। এই যে আড়ালে থাকা এইটা আমার মজা লাগত। দ্বিতীয়ত, আমার মধ্যে সবসময় একটা সংকোচ আছে। আমি খুব বেশি প্রকাশ্য হতে চাই না। যদিও আমি শিক্ষকতা করেছি, নাটকে অভিনয় করেছি একবারে কৈশোর থেকেই। কিন্তু আমার মধ্যে একটা সংকোচ কাজ করে। আমি যে সময়টার কথা লিখতাম, সেই সময়ে সংবাদ পত্রিকার এই উপ-সম্পাদকীয় খুব পাঠকপ্রিয় ছিল। সংবাদ সমাজতন্ত্র সমর্থন করত। জহুর হোসেন চৌধুরী তখন সম্পাদক। তিনি দরবার-ই-জহুর নামে জনপ্রিয় ছিলেন। উনি যখন মারা গেলেন তখন একটা শূন্যতা তৈরি হলো। তখন সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আবুল হাসনাত। হাসনাত আমার বন্ধুর মতো ছিলেন। তার মাধ্যমে সংবাদের সঙ্গে যোগাযোগটা হয়েছে। আমি আমার কলামের নাম দিলাম ‘সময় বহিয়া যায়’ আর লেখকের নাম দিলাম গাছপাথর। গাছপাথর মানে হচ্ছে গাছটা পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু সে দেখছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময়ের প্রভাবটা দেখছে। এটা আমি চৌদ্দ বছর লিখেছি। এখন ভাবলে বেশ আরাম পাই যে একটানা লিখেছি। একবার শুধু বিরতি ঘটেছিল। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে দুই তিন সপ্তাহ লিখতে পারিনি। আমি একবার এক মাসের জন্য চীনে গিয়েছিলাম। চীনে যাওয়ার আগে তিনটা লেখা দিয়ে গিয়েছিলাম।
আরেকটা কারণে আমি লিখেছি। তখন সমাজতান্ত্রিক পতন আসন্ন, পরে পতন ঘটল। ফলে ওই সময়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলাটা দরকার ছিল। আমি কিন্তু সমাজতন্ত্রের পক্ষে লিখতাম। তখন যারা সমাজতন্ত্রের পক্ষে আগে ছিলেন তারা অনেকেই পন্থা ত্যাগ করেছেন, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বলছেন, বিরূপবাদী হয়ে গেছেন। কিন্তু আমি মনে করতাম সমাজতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। পুঁজিবাদকে সংস্কার করে আমরা মানুষের মুক্তি আনতে পারব না। ওই যে আমি বলেছিলাম ‘অন্বেষণ’ ওই আমার অন্বেষণের কাল কেটে গেছে। কেটে যাওয়ার কারণ হলো বিদেশে যাওয়া। ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশোনার সময় এই বামপন্থি চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হলাম। যে সমস্ত বই আমরা এখানে পেতাম না, সেগুলো পেলাম। আমাদের যে বন্ধুরা ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন তারাও দেখি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমি একটা পথের সন্ধান পেলাম। আগে আমি অস্পষ্টভাবে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পক্ষে লিখতাম। পরবর্তী সময়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষে লিখেছিলাম।
দেশ রূপান্তর : আপনি যে ‘গাছপাথর’ নামে লিখতেন, মানুষ তো জানত আপনি এই নামে লিখছেন। তাতে কি কোনোরকম বাধাগ্রস্ত হয়েছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বাধাগ্রস্ত হইনি। সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। অনেক সময় তার মতের সঙ্গে আমার মত মিলেনি। তবুও তিনি লেখা প্রকাশ করেছেন। তখন পাঠকের প্রতিক্রিয়া আসত খুব। এটা একটা আনন্দের বিষয় ছিল। পাঠকরা যে প্রতিক্রিয়া জানাত এটা এখন আর নেই। পাঠকও কমে গেছে, প্রতিক্রিয়াও কমে গেছে।
দেশ রূপান্তর : ওই সময় তো অনেকে চিঠিও লিখত।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমার লেখাটা প্রতি মঙ্গলবারে বের হতো। রবিবারই নিয়ে যেতেন একজন এসে। তিনি আসার সময় অনেক পত্র নিয়ে আসতেন। প্রতিক্রিয়া সেগুলো। যেগুলো পড়ে জবাবও দিতাম লেখার মধ্য দিয়ে। ওইটা ছিল একটা জীবন্ত সময়। তখন পত্রিকার সংখ্যাও কম ছিল। মানুষ হয় ইত্তেফাক পড়ত না হয় সংবাদ পড়ত। কেউ কেউ অবজারভার পড়ত।
দেশ রূপান্তর : আপনার বইয়ের সংখ্যা কত হলো?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমার বই একশ ছাড়িয়ে গেছে। ছোট ছোট বই। কয়েকটা বই বড়।
দেশ রূপান্তর : এর মধ্যে তো গল্প উপন্যাসও আছে কয়েকটা।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি দুইটা উপন্যাস লিখেছিলাম। কিশোরদের জন্য একটি উপন্যাস লিখেছি। আমার গল্পের বইও আছে একটা। কিন্তু আমি ওই পথে যেতে পারিনি। আমার আগ্রহ ছিল কথাসাহিত্যিক হব। কিন্তু যেতে পারলাম না দুই কারণে। এক, আমার অভিজ্ঞতার অভাব। আমি একটি বৃত্তের মধ্যে আছি। যদিও বৃত্ত ভাঙার কথা বলি, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার জগৎটা সংকীর্ণ। দ্বিতীয়ত, কথাসাহিত্য এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্য এমন একটা স্তরে চলে গেছে, সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে বুঝতাম, আমি ওইখানে পৌঁছাতে পারব না। প্রবন্ধ লেখা বরং সোজা। কেননা প্রবন্ধে আমি আমার মতামত দিতে পারছি, নিজস্বতা তুলে ধরতে পারছি। কিন্তু কথাসাহিত্যের জন্য যে নৈর্ব্যক্তিকতা এবং শিল্পীর যে দূরত্ব, সেটা আমার নেই। অভিজ্ঞতার যে বিস্তৃতি সেটা আমার নেই। শিল্পীর একটা দূরত্ব থাকে, যে দূর থেকে তিনি দেখেন।
দেশ রূপান্তর : দেখার একটা...
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ। আমি তো জড়িয়ে পড়ি। যার কথা লিখব তার প্রতি হয় আমি সহানুভূতিশীল নয়তো বিরূপ। শিল্পীর এই যে দূরত্ব, সেটা সমর্থন করে না আমাকে। এসব কারণে আমার কথাসাহিত্যিক হওয়া হয়নি। তবে আমি যেটা চেষ্টা করেছি, সেটা হলো আমার প্রবন্ধের মধ্যেও কথাসাহিত্যের একটা সুর আনা, একটা আবহ তৈরি করা, গল্প বলার একটা ভাব তৈরি করা। এগুলো করেছি যাতে লেখাটা হৃদয়গ্রাহী হয়। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের প্রধান গুণ হচ্ছে লেখাকে হৃদয়গ্রাহী করা। আমি আমার লেখাকে হৃদয়গ্রাহী করার চেষ্টা করেছি। সফল হতে পেরেছি কি না সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু চেষ্টা করেছি।
দেশ রূপান্তর : আপনি সম্পাদনা করেন দীর্ঘ সময় ধরে। এখনো করছেন নতুন দিগন্ত। এটা কেমন করে করেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা সামাজিক উদ্যোগ। এর কোনো মালিকানা নেই। এটা অনুদানে চলে। এর বাইরে আমরা কিছু বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করি। এখন পত্রিকা বিক্রির জায়গাও কিন্তু সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আগে ঢাকা শহরে যে স্টলগুলো ছিল, সেগুলো নেই। রেলস্টেশনে যেভাবে পত্রিকা বিক্রি হতো সেভাবে নেই। সারা দেশে আমাদের নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহক আছে। তাদের কাছে আমরা পত্রিকা পাঠাই। আমরা লেখকদের কোনো পারিশ্রমিক দিতে পারি না। তাও লেখা পাই, লেখার অভাব হয় না। কিন্তু বিতরণের ব্যবস্থাটায় আমরা সন্তুষ্ট নই। আগে ঢাকা শহরে কত স্টল ছিল, যেখানে ছেলেমেয়েরা যেত, বই দেখত, নাড়াচাড়া করত। সেই স্টলগুলো নেই দেখে খুব দুঃখ লাগে।
দেশ রূপান্তর : আপনার অবর্তমানে পত্রিকাটার ভবিষ্যৎ কী, ভেবেছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, সেটা ভাবছি না। আমি অত দূরে ভাবি না। যা হওয়ার তাই হবে। আমি তো আর ঠেকাতে পারব না। ওইসব ভাবলে...। আমি আমার মৃত্যুর কথাও ভাবি না। কাজের মধ্যে আছি। প্রাত্যহিক কাজটাই আমার কাছে বড়। এর মধ্য দিয়েই সময় কেটে যায়।
দেশ রূপান্তর : স্যার, আগের তুলনায় এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গাটা কি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা খুব মজার ব্যাপার [হাসি]। আমরা পাকিস্তান আমলেও যতটা স্বাধীনতা ভোগ করছি, বাংলাদেশ আমলে ততটা করছি না। আইয়ুব খানের সময়ে আমাদের একটা সুবিধা ছিল যে ওরা বুঝত না। লেখা অনুবাদ করিয়ে তা দেখার এত সময় তাদের ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে লেখার স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। কোনো সরকারই এটিকে প্রসারিত করেনি। শুধু এরশাদের পতনের পর যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, ওই সময়ে আমরা একটু স্বাধীনতা ভোগ করেছি। তারপরে নির্বাচিত সরকার আসার পর থেকেই ওই একই অবস্থা।
দেশ রূপান্তর : একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং রাজনীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কী কী অন্তরায় রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এটা দূর করতে কী করা উচিত?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, এইটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেব এটাই কথা ছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সেই স্বপ্ন, সেই চ্যালেঞ্জটা আমরা বাস্তবায়িত করতে পারলাম না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ছিল। পারল না। এটা রাষ্ট্র চায় না। রাষ্ট্র চায় তিন ধারার শিক্ষা বজায় রাখতে। কেননা রাষ্ট্রের অবস্থান হচ্ছে শ্রেণির যে বিভাজন, সেই বিভাজনকে রক্ষা করা। এখন তো উচ্চবিত্তের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, বিদেশে চলে যাচ্ছে, এরাই শাসক। আর যে বাংলা মাধ্যম সেটা অবহেলিত। নানান রকম সংস্কার দিয়ে সেটিকে আঘাত করা হয়। সেখানে সংস্কৃতি গুরুত্ব পায় না। ওদিকে মাদ্রাসা বড় হয়ে উঠছে, যেখানে গরিব মানুষ যায়। তারা মনে করে তারা শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু এই শিক্ষা কোনো কাজে লাগছে না। এই তিন ধারার শিক্ষায় প্রমাণ করে যে সমাজে শ্রেণি বিভাজন গভীর হচ্ছে, আরও ব্যাপক হচ্ছে। সামাজিক বিপ্লব না ঘটলে এটা দূর করা যাবে না।
দেশ রূপান্তর : স্যার, আপনি তো সবার শিক্ষক, বাংলাদেশের শিক্ষক। আপনার শিক্ষকদের সম্পর্কে জানতে চাই যারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমার শিক্ষক ছিলেন জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতা। উনি একাত্তরে শহীদ। আমার আরেক শিক্ষক ছিলেন খান সারওয়ার মুরশীদ। মুনীর চৌধুরী আমার অল্প সময়ের শিক্ষক ছিলেন। পরে বাংলায় চলে গেছেন। কলেজ জীবনে আমার দুজন শিক্ষক ছিলেন। একজন অজিত কুমার গুহ। তিনি খুব নামকরা শিক্ষক ছিলেন। জগন্নাথ কলেজে পড়াতেন। খন্ডকালীন হিসেবে আমাদের পড়াতেন। আমি কিন্তু পড়েছি নটর ডেম কলেজে। তখন নটর ডেম কলেজের নাম ছিল সেন্ট গ্রেগরীস। ওই স্কুলেই পড়েছি। ওখানে ওই অজিত গুহকে পেয়েছিলাম। ওখানে আরেকজন আমেরিকান শিক্ষক ছিলেন ফাদার মার্টিন, ভাইস প্রিন্সিপাল। তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। সাহিত্যকে প্রাণবন্ত করতেন। তিনি নাটক, শেক্সপিয়রের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। সেখানে আমি অংশ নিয়েছিলাম।
আরেকজন শিক্ষক দৃষ্টান্ত ছিলেন আমার কাছে। তিনি হচ্ছেন বিসি রায়। বিসি রায় শিক্ষক হিসেবে খুব নামকরা না। কিন্তু তার যে বিদ্যানুরাগ, সেটা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করত। আমি যখন অনার্স পরীক্ষা দিই তখন স্যারের সঙ্গে আমার একটা নীরব প্রতিযোগিতা ছিল। ওই সময় পাঠ্যবই পাওয়া যেত না, তাই লাইব্রেরি যেতে হতো। কে আগে ঢুকব, ছিল সেই প্রতিযোগিতা। আমি মনে মনে ভাবতাম স্যারের আগে ঢুকব। কিন্তু বেশির ভাগ সময় দেখতাম, স্যার আগে ঢুকে গেছেন এবং সারা দিন বই পড়ছেন।
আরেকজন ছিলেন প্রফেসর হাবিবুল্লাহ, ইসলামের ইতিহাসের প্রধান। তিনি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। আমি ছিলাম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। সেটা হচ্ছে ঊনসত্তরের সময়। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের সময়ে জনগণ লড়াই করছেন স্বায়ত্তশাসনের জন্য। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সংগ্রামে লিপ্ত। হাবিবুল্লাহ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা মিছিল পর্যন্ত করেছি। এই শিক্ষকরা আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছেন। একেকজন একেকভাবে।
দেশ রূপান্তর : স্যার, অনেক তো লিখলেন। কিছু কি বাকি আছে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, লেখার কোনো শেষ নেই। জীবনের যেমন শেষ মৃত্যুতে, লেখারও শেষ যখন আর লিখতে পারব না তখন। যতক্ষণ পারব লিখব। এটাই জীবন। লেখাই হচ্ছে আমার কাজ। লেখা এবং পড়া এই দুটোতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই।
দেশ রূপান্তর : ধন্যবাদ স্যার। অনেক সময় দিলেন আজ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমিও অনেক কথা বলতে পারলাম। ভালো লাগল।