বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন গত ২৯ জুন। এ দেশের শিল্পজগতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রিয় একটি নাম। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন শিল্পীর সরাসরি ছাত্ররা, যারা নিজেরাই এখন দেশের প্রতিথযশা শিল্পী। তাকে স্মরণ করেছেন শিক্ষক, পাপেট শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আমাদের আলোকছত্রার এ সংখ্যার আয়োজন প্রিয় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও পুনর্লিখন করেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
মনিরুল ইসলাম
চিত্রশিল্পী
মুস্তাফা মনোয়ার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন এবং তার মতো একজন মানুষকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য। তাকে আমি একজন ‘কমপ্লিট আর্টিস্ট’ বা পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে দেখি। ছবি আঁকা, পাপেট শো, নাটক পরিচালনা কিংবা সংগীত সবক্ষেত্রেই তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। বিটিভির শুরুর দিকে সেট ডিজাইন থেকে শুরু করে প্রোডাকশনের মান উন্নয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য। শিল্পী হিসেবে তিনি অত্যন্ত উদার ও নিঃস্বার্থ ছিলেন। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে সাধারণত যে আত্মকেন্দ্রিকতা বা খামখেয়ালি স্বভাব দেখা যায়, তার মধ্যে সেসবের ছিটেফোঁটাও ছিল না।
তিনি আমাদের শেখাতেন যে, জীবনের প্রতিটি কাজের মধ্যেই শিল্পের ছোঁয়া থাকে। তিনি বলতেন, কথা বলা, হাঁটা কিংবা খাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলোতেও শিল্প ফুটে ওঠে। কাজের ক্ষেত্রে তার পরামর্শ ছিল, সবদিকে না ছুটে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে গভীর মনোনিবেশ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পী যদি সারাজীবন স্টুডিওর চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকেন, তবে তার শিল্পের প্রকৃত বিকাশ ঘটে না। জগৎকে জানার জন্য তাকে বাইরে বের হতে হয় এবং জীবনকে কাছ থেকে দেখতে হয়।
শিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় তিনি সবসময় চেষ্টা করতেন এমন কিছু সৃষ্টি করতে, যা তাদের নৈতিক ও নান্দনিক বোধের বিকাশ ঘটায়। বাংলাদেশে এথিক্স ও এস্থেটিকসের অভাব তিনি সারাজীবন পূরণের চেষ্টা করেছেন।
মানুষ শুধু বয়স বাড়লেই বৃদ্ধ হয় না; যেদিন থেকে মানুষের ভেতরের কল্পনাশক্তি হারিয়ে যায়, সেদিন থেকেই সে বৃদ্ধ হয়। মুস্তাফা মনোয়ার স্যার তার সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের মাঝে চিরকাল তরুণ হয়ে থাকবেন। তিনি আমাদের যে পথ দেখিয়েছেন, তা অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তার আত্মার শান্তি কামনা করি এবং বিশ্বাস করি, তার মতো মানুষের অভাব কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
সাইদুল হক জুইস
দৃশ্যশিল্পী, পাপেটিয়ার
মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয়টি ঘটে আর্ট কলেজে পড়াকালীন সময়ে। প্রথম বর্ষে থাকাকালে তাকে সরাসরি দেখার সুযোগ খুব বেশি হয়নি, তবে দ্বিতীয় বর্ষে উঠার পর এক সিনিয়র শিল্পীর মাধ্যমে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আসে। তিনি কয়েকজন আগ্রহী ছাত্র খুঁজছিলেন, বিশেষ করে পাপেট বা পুতুলনির্ভর কাজের জন্য। আমরা কয়েকজন তখন আগ্রহ নিয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হই।
সময়টা ১৯৭৮ সালের দিকে। প্রথমদিকে কাজ শুরু হয় গ্লাভস পাপেট দিয়ে যে ধরনের পাপেটে হাত ঢুকিয়ে নড়াচড়া করানো হয়। পরে তিনি ধীরে ধীরে অন্যান্য পাপেট ফর্ম নিয়েও কাজ শুরু করেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় আমরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। শিশু একাডেমিতে শিশুদের জন্য একটি প্রযোজনার কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমরা শুধু পাপেট নির্মাণ নয়, সেট ডিজাইন, আলো ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করি। সেই সময়টাকে আমাদের জন্য এক ধরনের শিক্ষা লাভের পর্ব বলা যায়।
পরবর্তী সময় সুন্দরবনভিত্তিক একটি প্রজেক্টে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। যদিও শুটিংয়ের পুরো প্রক্রিয়া আমরা দেখিনি, তবে অ্যানিমেশন, সেট ও এডিটিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতায় তার সঙ্গে কাজ করতে করতে তার কাজের ধরন এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধীরে ধীরে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।
শিল্পচর্চার দিক থেকে তার জলরঙের কাজ আমাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল। কলকাতার আর্ট কলেজে পড়ার সময় তিনি জলরঙে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন এবং সে সময় স্বর্ণপদকও লাভ করেন। তার কাজের বৈশিষ্ট্য ছিল কম রঙ ও স্বল্প টোনাল কনট্রাস্ট ব্যবহার করে আলো-বাতাসের সূক্ষ্ম অনুভূতি তৈরি করা। কলকাতায় প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে তিনি নিজস্ব এক শৈলী নির্মাণ করেন, যেখানে ইউরোপীয় ও জাপানি প্রভাবের একটি মিশ্রণ লক্ষ করা যায়।
ঢাকায় ফিরে তিনি যদিও দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেননি, তবে তার কাজ এবং প্রভাবের মাধ্যমে জলরঙের একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময় যারা জলরঙে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তার প্রভাব বহন করেছেন। আমাদের সময়েও আর্ট কলেজে জলরঙের প্রাধান্য ছিল বেশ স্পষ্ট।
তার কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধারাবাহিক অনুসন্ধান। তিনি একটি মাধ্যম বা বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতেন, তারপর আগ্রহের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য মাধ্যমে চলে যেতেন কখনো সংগীত, কখনো আবৃত্তি, কখনো টেলিভিশন। এই পরিবর্তনশীলতা তার সৃজনশীলতার একটি অংশ ছিল।
তার সঙ্গে কাজ করে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি শিখেছি, তা হলো একটি ছোট ধারণা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া। সেট ডিজাইনের ক্ষেত্রেও তিনি এমনভাবে কাজ করতেন, যেখানে একটি ভিজ্যুয়াল নিজেই নিজের বক্তব্য তৈরি করতে পারত। এই অভিজ্ঞতা আমাকে পরবর্তী সময় স্বাধীনভাবে কাজ করার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
ব্যক্তিত্বের দিক থেকে তিনি ছিলেন সংযত এবং সহনশীল। কাজের সময় ভুল হলেও তিনি কখনো রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। বরং রসিকতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতেন। একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে শিশু একাডেমিতে একটি পাপেট ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি রাগ না করে হালকা রসিকতার মাধ্যমে বিষয়টি গ্রহণ করেছিলেন। এ ধরনের আচরণ আমাদের কাজের পরিবেশকে স্বস্তিদায়ক করে তুলত।
১৯৭৯ সালে তার সঙ্গে তাসখন্দে একটি আন্তর্জাতিক পাপেট উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে আমরা আধুনিক পাপেট ফর্ম উপস্থাপন করি, পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচের একটি দলও অংশ নেয়। দুই ধরনের পাপেট উপস্থাপনার কারণে আমাদের কাজ বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দর্শকদের আগ্রহ ছিল লক্ষণীয় অনেকে মঞ্চে উঠে পাপেটগুলো কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেন।
মোহাম্মদ ইকবাল
শিল্পী ও শিক্ষক
মুস্তাফা মনোয়ারের কাজের বিস্তার ছিল বহুমাত্রিক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তিনি নতুনমাত্রা যুক্ত করেছেন। বিশেষত জলরঙ চিত্রকলায় তার দক্ষতা সুপরিচিত। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেও তিনি সৃজনশীল ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ‘স্কুল’ তৈরি হয়েছিল তার কাজের ভেতর দিয়ে।
পাপেট্রির ক্ষেত্রেও তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। লোকজ পুতুলনাচের ধারাকে তিনি আধুনিক রূপ দিয়েছেন এবং সেটিকে একটি চিন্তাশীল ও অভিব্যক্তিমূলক মাধ্যমে পরিণত করেছেন। তার প্রযোজনাগুলোর মাধ্যমে দেশ, সমাজ এবং মানুষের অভিজ্ঞতা সহজভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
সংগীত, চিত্রকলা, পাপেট এবং নাট্যচর্চা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। এই বহুমুখী সম্পৃক্ততা তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ ধরনের শিল্পী খুব ঘন ঘন দেখা যায় না এমনটাই মনে করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কাজ ও বিভিন্ন আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তিনি অত্যন্ত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। যেকোনো বিষয়ে তিনি সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন এবং জটিল বিষয়কেও সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন।
নাসিমুল খবীর ডিউক
শিল্পী ও শিক্ষক
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে মুস্তাফা মনোয়ারকে মূল্যায়ন করতে গেলে প্রথমেই তার বহুমাত্রিকতার কথা আসে। তিনি কেবল চিত্রশিল্পী নন; সংগীত, নাটক, পাপেট্রি ও টেলিভিশন প্রযোজনায় সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন। আজ যাকে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ চর্চা বলা হয়, তিনি তা অনেক আগেই প্রয়োগ করেছিলেন।
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার সূচনালগ্নে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমকে একত্রে যুক্ত করে তিনি একটি স্বতন্ত্র অভিব্যক্তি নির্মাণ করেন যা তার কাজের অনন্যতা তৈরি করে।
নাট্যচর্চায়, বিশেষত বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রারম্ভিক সময়ে, তিনি দৃশ্যনির্মাণ, সেট ডিজাইন ও শিল্প নির্দেশনায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের টেলিভিশন রূপায়ণ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তিনি শেক্সপিয়র ও হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের রচনাকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে রূপান্তর করেছেন, পাশাপাশি লোকজ উপকথাকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন যার মাধ্যমে বৈশি^ক ও স্থানীয় শিল্পভাষার সংলাপ তৈরি হয়।
জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনা নির্মাণেও তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। স্বকীয়তা রক্ষা এবং বৈশি^ক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সংযোগ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে তিনি একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
বর্তমান সময়ে তার কাজ ও জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, বহুমাত্রিক ও সংযুক্ত শিল্পচর্চার প্রয়োজনীয়তা। কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং আধুনিকতার প্রশ্ন এসব বিষয়কে তিনি শিল্পচর্চার ভেতর দিয়ে অন্বেষণ করেছেন।
শাওন আকন্দ
শিল্পী ও গবেষক
মুস্তাফা মনোয়ারকে মূল্যায়ন করতে গেলে তার বহুমাত্রিক চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় বহুমাধ্যমিক কাজের যে ধারণা আজ গুরুত্বপূর্ণ, তিনি তার পথিকৃৎদের একজন। শিল্পের বিভিন্ন শাখাকে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল প্রভাবশালী ও বাস্তবভিত্তিক।
চারুকলায় তার শিক্ষকতা দীর্ঘ না হলেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, তার কাজ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে তিনি টেলিভিশন, নাটক ও অন্যান্য মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন যা ছিল বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।
তিনি কেবল চিত্রশিল্পী নন; সংগীত, নাটক ও পারফর্মিং আর্টের বিভিন্ন ধারায়ও তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। চারুকলায় চৈত্রসংক্রান্তির গান থেকে শুরু করে নাট্যচর্চা সব ক্ষেত্রেই তিনি শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক তৈরি করেছেন, যা তিনি বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে তার প্রশাসনিক ভূমিকা তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিরই সম্প্রসারণ। এই অবস্থানগুলো থেকেও তিনি সাংস্কৃতিক পরিসরে কার্যকর প্রভাব রেখেছেন।
পাপেট্রিকে আধুনিক ধারায় প্রতিষ্ঠা করা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। লোকজ পুতুলনাচের ঐতিহ্যকে নতুন ভাষা ও উপস্থাপনায় তিনি সমকালীন প্রেক্ষাপটে জনপ্রিয় করে তোলেন, যা পরবর্তী সময় একটি স্বতন্ত্র শিল্পধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তার প্রভাব প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত তার ছাত্র এবং তাদের ছাত্রদের মধ্য দিয়ে একটি ধারাবাহিক শিল্পঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। এই অর্থে তাকে ‘শিক্ষকের শিক্ষকের শিক্ষক’ বলা যায়।
তার কাজ ও ব্যক্তিত্ব একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে শিল্প, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান একসূত্রে গাঁথা। তাই তার অনুপস্থিতি কেবল একজন শিল্পীর নয়, একটি সময়ের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে। তার মতো বহুমাত্রিক শিল্পী সত্যিই বিরল।
সঞ্জয় চক্রবর্তী
শিল্পী ও শিক্ষক
রঙতুলি এবং ক্যানভাসের বাইরে বাংলাদেশের যে কয়েকজন শিল্পী শিল্পের জগৎটাকে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছিলেন তার মধ্যে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার অন্যতম। বাংলাদেশের সব আন্দোলন সংগ্রামে যেমন তার ভূমিকা ছিল, পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক তৈরির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে সারাটা জীবন কাজ করে গেছেন এই শিল্পী। বাচ্চাদের মনে নারীর অবস্থান তৈরির জন্য তার অসাধারণ সৃষ্টি পারুল চরিত্রটি, যার মাধ্যমে তিনি একজন সমাজ সচেতন শিল্পী হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হন। পারুল চরিত্রটি শিশুদের পাশাপাশি আমাদের প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখায়, পশুকে ভালোবাসতে শেখায় এবং শেখায় সহমর্মিতা। এসব কিছুর জন্য তিনি বাঙালির কাছে অমর হয়ে থাকবেন।
শাহরিয়ার শাওন
পাপেটিয়ার ও নাট্যকর্মী
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জলপুতুল পাপেটস
মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় সব শিশুর যেভাবে হয়, ঠিক সেভাবেই। ছোটবেলায়, আশির দশকে বিটিভির ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আসলে এই অনুষ্ঠানটিই ছিল আমাদের সৃজনশীল হয়ে ওঠার প্রথম অনুপ্রেরণা।
সরাসরি পরিচয় ঘটে ২০০২ সালে, একটি কর্মশালার মাধ্যমে। মানুষ হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করা আমাদের মতো মানুষের পক্ষে কঠিন। তিনি যেন এক ‘মহিরুহ’ আর আমরা ‘তৃণ’। তৃণ কখনো মহিরুহকে বিচার করতে পারে না সেই সামর্থ্য আমাদের নেই।
স্যারকে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে একটি শব্দই যথেষ্ট ‘ঞযব চবৎভবপঃরড়হরংঃ’. তিনি এমন একজন শিল্পী, যার কাছে ৯৯ শতাংশ কখনোই পূর্ণতা নয়। ১০০-তে পৌঁছানোই ছিল তার লক্ষ্য।
আমরা যেটাকে ভালো কাজ বলে মনে করতাম, তার কাছে সেটি অনেক সময় ৫ শতাংশও নয়। এই নিখুঁততার সাধনাই তাকে আলাদা করে।
তার পাপেট্রি ছিল একটি সম্পূর্ণ জগৎ। তার বাসা যেন একটি পাপেট-ভুবন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে ছাদ পর্যন্ত। ছাদের গাছগুলোও কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রোডাকশনের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সেট নির্মাণে তিনি বাস্তব ও কৃত্রিম উপাদান এমনভাবে মিশিয়ে দিতেন, যাতে বোঝা যেত না কোনটি আসল, কোনটি নয়। এই ভিজ্যুয়াল বিভ্রম তৈরি করার দক্ষতা ছিল তার অনন্য শক্তি।
একবার পাশের একটি বাড়ি ভেঙে ফেলার সময় একটি পুরনো কামিনী গাছ কেটে ফেলা হয়। স্যার সেটি ৩০ হাজার টাকায় কিনে রাখেন। পরে সেই গাছের ডাল ব্যবহার করে মিনিয়েচার সেটে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা ক্যামেরায় এক বিশাল জঙ্গলের বিভ্রম তৈরি করে।
এই ঘটনাই দেখায় একজন শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি কত গভীর হতে পারে। যেখানে আমরা শুধু একটি গাছ দেখি, তিনি সেখানে সম্ভাবনার এক মহাবিশ্ব দেখতেন।
১৯৭১-এর আগে তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে পড়াশোনা করেন এবং জলরঙ ও সংগীতে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শরণার্থী শিবিরে গান গেয়ে এবং ছবি এঁকে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন। পাশাপাশি পাপেট্রিকে নতুনভাবে ব্যবহার করেন যা পরবর্তী সময় একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
স্যারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল এক অনন্য শিক্ষা। তিনি অত্যন্ত সহজ এবং আন্তরিক মানুষ।
তিনি শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতেন ‘তোমরা করে ফেলো’ এই বিশ্বাস দিয়েই শুরু হতো কাজ।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন
শিশুদের জন্য কাজ করা মানে ভবিষ্যৎ গড়া
ভাষার সৌন্দর্য বজায় রাখা
কাউকে কষ্ট না দিয়ে কথা বলা
যেকোনো কুৎসিত জিনিসেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া
সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল মনোযোগের :
‘একটি তারে একটি সুরে একটি মনেই কর রে সাধন।’
এই বাণী তিনি বারবার বলতেন। একসঙ্গে অনেক কিছু নয় একটি বিষয়ে মনোযোগ দিলে তবেই সত্যিকারের সৃষ্টিতে পৌঁছানো যায়।
সাইফুল জার্নাল
সংস্কৃতি কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
জলপুতুল পাপেটস
মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা শুরুতে কিছুটা ভীতিকর মনে হলেও খুব দ্রুতই তা বদলে যায়। কাছ থেকে তিনি অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক ও আন্তরিক একজন মানুষ বিশেষ করে ছোটদের সঙ্গে তার আচরণ ছিল বন্ধুসুলভ। ফলে কাজের পরিবেশ হয়ে উঠত স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং মনে হতো কাজটি করা সম্ভব।
তিনি কাজের দায়িত্ব অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছেড়ে দিতেন, তবে নির্দেশনা দিতেন নীরবে ও সুনির্দিষ্টভাবে। এই স্বাধীনতাই নতুনদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করত এবং কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করত।
কাজের প্রতি তার একাগ্রতা ছিল অসাধারণ। দীর্ঘ সময় ‘অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা’ তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতেন। তার এই উপস্থিতি ও নিষ্ঠা দলের অন্যদেরও কাজের মধ্যে ধরে রাখত।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী সময় পাপেট্রিকে আরও গণমুখী করার চেষ্টা শুরু হয়। তার ধারা অনুসরণ করলেও, ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করে প্রান্তিক মানুষ ও শিশুদের কাছে এই মাধ্যম পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিশুদের নিয়ে কাজ করার প্রেরণাটিও তার কাছ থেকেই আসে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পচর্চা শিশুদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যা একটি মানবিক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
ভাষা ব্যবহারে তিনি ছিলেন পরিশীলিত ও সংযমী। বাংলা ভাষার সুললিত ব্যবহার এবং শালীনতার প্রতি তার গুরুত্ব সহকর্মীদের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।
নান্দনিকতার ক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণ উপাদানকেও কীভাবে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করা যায়। রূপান্তরের এই ক্ষমতাই তার কাজকে আলাদা করে তোলে।
তার কাছ থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল মনোনিবেশ একসঙ্গে অনেক কিছু নয়, একটি বিষয়েই সম্পূর্ণ মন দেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজের শৃঙ্খলা ও গভীরতা তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগুলোই পরবর্তীকালের কাজের ভিত্তি তৈরি করেছে বিশেষ করে শিশুদের জন্য শিল্পচর্চা, সমাজমুখী প্রয়াস এবং নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।