বন্যার অভিঘাত

ত্রাণ-পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিন

টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের কয়েকটি বিভাগে বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে । ১১ জুলাই দেশ রূপান্তরে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোতে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বিপন্ন-বিপর্যস্তদের তালিকা দীর্ঘ হয়ে চলেছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা খুবই নাজুক। একদিকে বন্যার আগ্রাসী রূপ, অন্যদিকে পাহাড়ধসে হতাহতের মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলো বেদনার উপাখ্যান ভারী করে তুলেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়ে ভিটাচ্ছন্ন হয়েছে অনেক মানুষ। কয়েকটি নদীর পানি বইছে বিপদসীমার ওপরে। চট্টগ্রামে ইতিমধ্যে সাড়ে সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বন্যায় প্রাণহানি ঘটেছে ১১ জনের। আর পাহাড়ধসে গত তিন দিনে প্রাণহানি ঘটেছে ৩০ জনের।

এবার পাহাড়ধস ও বন্যা একসঙ্গে হানা দিয়েছে চট্টগ্রামে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বন্যার প্রকোপ আরও বাড়তে পারে এবং এই প্রেক্ষাপটে জনদুর্ভোগের বিষয়টিকে অগ্রগণ্য বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট এলাকার মন্ত্রী, এমপিসহ অন্য দায়িত্বশীলদের দুর্যোগ মোকাবিলায় নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অতি দ্রুততার সঙ্গে যে মানবিক পদক্ষেপ নিয়েছেন এ জন্য তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে যূথবদ্ধভাবে দুর্যোগ আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ দিই। আমরা জানি, দেশের সিংহভাগ নদনদী দখলে-দূষণে ও নাব্য হারিয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। অনেক স্থানে মানচিত্রে মৃতপ্রায় খরস্রোতা নদনদী এবং এর বিরূপ প্রভাব হয়ে উঠেছে বহুমুখী। সামান্য বৃষ্টিতেও পানি ধারণক্ষমতা হারানো এসব নদনদী উপচে প্লাবণের অভিঘাত সরাসরি লাগছে জমিনে-জনবসতিতে। বাড়ছে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা। ঋতুবৈচিত্র্য ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনও বন্যার প্রকোপ তীব্র করছে।

এখন সর্বপ্রথম কাজ হলো, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় আশ্রিতদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের পাশাপাশি তাদের গবাদিপশুসহ সহায়-সম্পদের যথাযথ সুরক্ষা। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বানের পানি নামার পর ত্রিমাত্রিক সংকট বড় হয়ে দেখা দেয়। প্রথমত, বানবাসীদের সামনে ভিটেমাটির ক্ষত তাদের জন্য দুঃসহ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত,  নানারকম পানিবাহিত রোগব্যাধির সংক্রমণ বাড়ে। তৃতীয়ত, কর্ম সংকট প্রকট হয়ে উঠায় জীবন-জীবিকায় চরম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। আমরা মনে করি, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে এগুলোকে বিবেচনার অগ্রভাগে রাখা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতায় আরও আছে, ত্রাণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট অসাধু দায়িত্বশীলরা নয়ছয়ে মেতে উঠেন, মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের উদর পূর্তি করেন। আমরা আশা করব, সরকার এ ব্যাপারে কঠোর ও অমার্জনীয় অবস্থান দৃঢ় করবে।

বন্যাক্রান্ত যারা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন, তাদের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে ঘরবাড়িতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত। এরপর প্রত্যেকের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে যাদের ঘরবাড়ি ও কৃষি, মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। যাদের বীজ প্রয়োজন তাদের বীজ দিতে হবে, যাদের ঘর মেরামত জরুরি তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও  নিজ দলপ্রীতির সুযোগ নেই। আমরা আশা করি, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে সুচারুভাবে কাজটি করবেন সরকারের আন্তরিকতা-সদিচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। অতীতের অনাচার-কদাচারের ছায়া যেন এসব কার্যক্রমে না পড়ে সে জন্য ঊর্ধ্বতনদের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল সবদিকেই পরিস্থিতি অনুসারে বিপন্ন-বিপর্যস্তদের জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। একই সঙ্গে বন্যা প্রতিরোধে এবং এর স্থায়ী সমাধানে চিহ্নিত সমস্যা-সংকটের নিরিখে দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও মনোযোগ গভীর করা বাঞ্ছনীয়। অস্বীকারের উপায় নেই যে, বাঁধ-সড়ক-স্থাপনার নির্বিচার প্রতিবন্ধকতায় নদনদী-বিল-জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। পানি ঢুকলে সহজে আর নামে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মানুষ প্রায় প্রতি বছর বন্যায় ভাসছে-ডুবছে। এও অসত্য নয়, প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধসম অবস্থা কিছু মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকা-ে আজ আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যা-দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লিখিত সব বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।