মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সরীসৃপ’ রূপক গল্পটি এমন, কেউ সেখান থেকে বের হতে পারে না। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। আজ হোক বা কাল, তারা একজন অন্যজনের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালাতে পারে। একসময় দুই নেতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলেছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বিশ^াস করিয়েছিলেন- ইরানকে খুব দ্রুত পরিষ্কারভাবে এবং কোনো প্রকৃত মূল্য ছাড়া চূর্ণ করে দেওয়া সম্ভব। ট্রাম্প তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। কারণ তার কথায় সন্দেহ প্রকাশ করার চেয়ে, বিশ্বাস করা সহজ ছিল। আর সন্দেহ এমন কোনো মুদ্রা নয়, যা দিয়ে ট্রাম্প লেনদেন করেন। কিন্তু যুদ্ধ যখন শুরু হলো, প্রথম সারির নেতৃত্ব হারিয়েও ইরান ভেঙে পড়ল না। তারা এখনো যুদ্ধ করছে। ইরানিদের দৃঢ়তা বিস্ময়কর। দেশটিকে ভেতর থেকে ভাঙা কিংবা বিভেদের দেয়াল তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা সফল হলো না। ফলে চরম মূল্য পরিশোধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। যুদ্ধ বিলের বিরাট অঙ্ক পৌঁছাল ট্রাম্পের দরজায়। খরচের লম্বা তালিকায় নেতানিয়াহু গৌণ।
শিকাগো বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক জন মিয়ারশেইমার অকাট্য যুক্তি ছিল, ইসরায়েল এবং তাদের লবি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রাম্প বারবার জেরুজালেমের সুরেই নাচতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই নাচে বিপত্তি ঘটল লেবাননের উঠানে। লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্প একদিকে, নেতানিয়াহু আরেক। দুজনের গলাগলি, গালাগালিতে পরিণত হলো। যদিও গালিতে বেশ দক্ষ ট্রাম্প। কিন্তু নেতানিয়াহুর হজম শক্তি ভালো। এই ইস্যুতে পনেরো মিনিটের ফোন কলের প্রতিবেদনে জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর চিৎকার করছিলেন। জানতে চাচ্ছিলেন, তিনি আসলে কী ছাইপাশ করছেন। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন। তাকে মনে করিয়ে দেন, আমেরিকার সুরক্ষা না থাকলে তিনি কারাগারে
থাকতেন। অত্যন্ত পীড়াদায়ক ভাষায় তাকে তিরস্কার করে বলেন, বিশ্ব এখন তাকে ঘৃণা করে। নেতানিয়াহু নীরবে অপমান সয়ে নেন, যেভাবে সবকিছু সহ্য করেন। এরপর তিনি দাবি করেন, কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইসরায়েলের ‘অবস্থান আগের মতো’। যদিও ট্রাম্পের আদেশে মার্কিন সেনারা বৈরুত থেকে পিছু হটেছিল। রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে দুজন মানুষের একে অপরকে প্রয়োজন, তারাই একে অপরকে মারাত্মকভাবে দংশন করতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম। ট্রাম্প এরই মধ্যে দেখিয়েছেন, যুদ্ধ যখনই তার উপকারে আসবে না, সেই মুহূর্তেই তিনি নেতানিয়াহুকে অপমান করবেন। নেতানিয়াহুও দেখিয়েছেন যে তার রাজনৈতিক জোট যখনই দাবি করবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি ট্রাম্পের আদেশ অমান্য করবেন। এই হুল ফোটানো বা দংশন যখন শেষ পর্যন্ত আসবে, তা কোনো আদর্শিক কারণে হবে না। তা হবে স্রেফ আত্মরক্ষা, যা নীতির আবরণে ঢাকা থাকবে। আর তা ঘটবে লেবানন, গাজা ও ইরানের হাড় দিয়ে তৈরি একটি বয়ামের ভেতরে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তী সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক এখন তলানিতে। একসময় যারা একে অপরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন, আজ তারা কার্যত একই যুদ্ধের ভিন্ন সমাপ্তি চাইছেন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সময়, দুই নেতার লক্ষ্য ছিল প্রায় অভিন্ন। ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল আরও বড়। ইরানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং সম্ভব হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করা। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, দুই নেতার হিসাব তত বদলেছে। ট্রাম্পের সামনে জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি, নির্বাচনী রাজনীতি এবং আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সামনে ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা, হিজবুল্লাহকে দুর্বলের সুযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াই। ফলে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে দুই মিত্রের মধ্যে লক্ষ্যগত দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহুর দৃষ্টিতে এটি একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এটি সফল সমঝোতা।
যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে কিছু অর্জিত হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরানের সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে, কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পিছিয়ে দিয়েছে। নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা ইসরায়েলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছি।’ অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফলাফল নেতানিয়াহুর প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান ভিন্ন। তিনি যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে শেষ করতে চেয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিজয় দাবি করতে পারে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুরুতে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেখালেও শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, যুদ্ধ থামানো এবং একটি রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরির মতো তুলনামূলক সীমিত লক্ষ্যে সন্তুষ্ট হয়েছেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক বহুবার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। তাদের সম্পর্ক পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়েছিল। কখনোই আদর্শিক ছিল না। যখন দুই নেতার লক্ষ্য এক ছিল, তখন সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। এখন লক্ষ্য আলাদা হয়ে যাওয়ায়, সম্পর্কও শীতল হয়েছে। রয়টার্সের ভাষায়, দুই নেতা এখন সংঘর্ষের পথে এগোচ্ছেন। তবে এটাও সত্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু সব বিশ্লেষণে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক হয়তো গালাগালি থেকে গলাগলির দিকে যেতে পারে। যদিও পুনারায় ইরানে হামলা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প জীবননাশের হুমকিতে আছেন। স্পষ্ট নয়, ঝামেলা ঠিক কোথায়!
লেখক : সাংবাদিক