ব্যবস্থাপানাগত ত্রুটির কারণে আমাদের অনেক অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে, এই সত্য এড়ানো কঠিন। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফল যে ভালো হয়নি এ আর নতুন করে বলার কিছু। সুপ্রিম কোর্টের এদেশে সেই ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, যা এখন আইনে পরিণত করার দায়িত্ব জাতীয় সংসদের। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আরও কিছু বিষয় সংশোধনীর পাশাপাশি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের বিধানটি তুলে দিলে পরবর্তী ৩টি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) অনুষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন দলের অধীনে। এই বিধানটি তুলে দেওয়া যে কত বড় হঠকারিতা ছিল তা প্রমাণিত হয় এই নির্বাচনগুলো এবং সেই সঙ্গে প্রবল গণআন্দোলনে মাধ্যমে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের করুণ পরিসমাপ্তির মধ্য দিয়ে। নির্দলীয় এবং অনির্বাচিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে দেশে অসাংবিধানিক শাসনের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যার বড় প্রমাণ ১/১১ পরবর্তী শাসন এটাই ছিল তাদের মূল অজুহাত, অথচ তাদের অধীনে তথাকথিত নির্বাচনগুলোর সূত্র ধরেই দেশে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল! দেড় বছরের সেই সংকটের অবসান ঘটে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির সরকার গঠনের মাধ্যমে। এর মাঝখানে ঘটে গেল কত ঘটনা!
গত ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়টি বহাল রেখে রায় প্রদান করেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে এ নিয়ে আর কোনো ধরনের সংশয়, সন্দেহ আর শঙ্কার অবকাশ রইল না। নিশ্চিতভাবেই আগামীর জাতীয় নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর এ নিয়ে করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে সে বছরের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাঙ্ঘর্ষিক বলে রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। উল্লেখ্য, ২০ ধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং ২১ ধারায় গণভোট বাতিলের বিষয়টিকে হাইকোর্ট বাতিল বলে রায় প্রদান করেন। একই সঙ্গে এই রায়ে বর্তমান সংবিধানের ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ রয়েছে, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আছে এবং বলা হয়েছে যে, সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি পরিবর্তন করা যাবে না, সেটা করা হলে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য হবে। এই বিধানাবলিও বাতিল হয়, যার অর্থ হচ্ছে সংসদ চাইলে এ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বাদ বাকি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণসহ সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ের পর কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক পঞ্চদশ সংশোধনীটিই বাতিলের জন্য সুপ্রিম কোর্ট বরাবরে রিট করলে আদালত শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায়টি বহাল রাখে।
কোর্টের রায়ে এই তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ছাড়াও আরও কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের সমাধান এসেছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের পরিবর্তন আনে। এই রায়ের মাধ্যমে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন বাতিল বলে ঘোষণা করেছে। বিজ্ঞ আদালত যে বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি সেগুলো হচ্ছে সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি, ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত বিষয়গুলো। এর মধ্য দিয়ে কার্যত আইন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, ৭ মার্চ এবং ২৬ মার্চ বৈধতা পেল, অর্থাৎ এর ব্যত্যয় আইনের ব্যত্যয় বলে পরিগণিত হবে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বর্তমান সংসদ কী করবে না করবে সেটা সময় বলে দেবে। রাজনৈতিক সরকারের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক মতৈক্যের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি প্রক্রিয়াগত বিষয় এবং কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মধ্য দিয়ে গঠন করা কোনো সরকার চাইলেই, কিংবা অপরাপর দলগুলো না চাইলে এবং সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে, কিংবা থাকলেও নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর বিষয়ে ঐকমত্য না থাকলে সংবিধান সংস্কার করা সম্ভব নয়। সেই বিবেচনায় বলা যায়, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক বিষয়ের নিষ্পত্তি ঘটেছে।
যে বিষয়টির ওপর ভিত্তি করে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, সেটি হচ্ছে আপিল বিভাগের একটি রায়। ২০১১ সালের ১০ মে এই রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আদালতের রায়টি সর্বসম্মত ছিল না, ৭ জন বিচারপতির মধ্যে ৩ জন এবং ১০ জন অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে ৮ জনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিপক্ষ্যে তাদের মত দিয়েছিলেন। আদালত এসবকে অগ্রাহ্য করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দিয়েছিলেন, যদিও সে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে না দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী দুটি নির্বাচন এ ধরনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছিল। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ এক রায়ে জিয়াউর রহমানের আমলের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে, যার মধ্য দিয়ে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিষয়টি সামনে চলে আসে। মূলত এটিকেই ভিত্তি করে তৎকালীন সরকার ভবিষ্যতে অগণতান্ত্রিক পন্থায় যেন কেউ আর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারে সে লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর উদ্যোগ নেয়। এই লক্ষ্যে ১৫ সদস্যের সংসদীয় কমিটি করে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ওই কমিটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের কোনো সদস্য যোগ না দেওয়ার ফলে এটি এককভাবে আওয়ামী লীগ সাংসদদের মাধ্যমে গঠিত হয়। সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করে, যেখানে প্রায় সবাই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। কমিটির সদস্যরা নিজেরাও এর পক্ষে ছিলেন। একই বছরের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটির বিশেষ সভায় শেখ হাসিনা নিজেও এর পক্ষ্যে মত দেন। কিন্তু পরবর্তী সময় ১০ মে আপিল বিভাগের রায়ের পর ৩০ মে আবারও সভায় যোগ দিয়ে এর বিপক্ষে নিজের অবস্থান নেন। এটি সম্ভব হয়েছিল সে সময়ের সংসদে তাদের এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকার সুবাদে। আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার নিমিত্তে ৩ মাস সময় পাবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে আরও কিছু বিষয় সংসদ কর্র্তৃক নিষ্পত্তির বিষয় রয়েছে, এক্ষেত্রে সরকার এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে আদালত কর্র্তৃক অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর বাইরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, এর মেয়াদকাল, গঠন ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে। পূর্বের ব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আকার ছিল প্রধান উপদেষ্টাসহ ১১ জনের। এটি কমানো বা বাড়ানো কিংবা এ নিয়ে নানা বিতর্কের আলোকে নতুন করে সিদ্ধান্তের দাবি রাখে।
এখানে আমরা নতুন করে কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। সেগুলো হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হলেও এবং দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে সম্পাদিত হলেও রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো এবং রাজনীতিবিদরা চরমভাবে আস্থাহীন। এটি গণতন্ত্রের সুবার্তা নয়। সেই সঙ্গে আমাদের এটাও স্মরণে রাখা দরকার যে, একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া নিয়মিত ভিত্তিতে আর কোনো দেশের নির্বাচনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় না। পাকিস্তানে এভাবে হলেও তা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত নয়, বরং একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে কেবল ৫ মাসের কাছাকাছি হলো। এই সময়ের মধ্যে সরকারি এবং বিরোধী দলের অনেক সংসদ সদস্যই নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। বিশেষ করে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা, যাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার সুযোগে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু চেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই প্রবণতা আরও বাড়লে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও আস্থার সংকটে পড়বে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে এই আস্থাহীনতা কার্যত জনগণের কাছে এই বার্তাই দেয়, আমাদের দেশের মতো দেশের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই রাজনৈতিক দল কর্র্তৃক একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় যথেষ্ট দক্ষতার দাবিদার নয়। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা থেকে নিদারুণ পরিণতি বাস্তবে দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিদ্যমান পক্ষগুলোর নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার কৌশল বৈ আর কিছুই নয়। একটি অর্থবহ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজন অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক এবং নির্বাচনের পরিবেশ, এক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কেবল নির্বাচনটাই সুষ্ঠুভাবে করতে সক্ষম, পরিবেশ নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। এই উপলব্ধি না থাকলে ঘুরেফিরে সব নির্বাচিত সরকারকে একসময় একই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
লেখক : দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mfulka@yahoo. com