নিকুঞ্জে কল্কিসহ গাঞ্জা রিফাত গ্রেপ্তার 

রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকার জামতলার বালুর মাঠে দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগ ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের। অভিযোগ অনুযায়ী সন্ধ্যা নামলেই মাঠের একটি অংশে প্রকাশ্যে চলত গাঁজা সেবন, মাদক কেনাবেচা এবং তরুণদের মাদকের দিকে প্রলুব্ধ করার নানা তৎপরতা।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে বহুদিন ধরে উদ্বেগ থাকলেও শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় পুলিশের অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই অভিযোগের একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায়।

খিলক্ষেত থানা পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে মো. রিফাত ইসলাম ওরফে ‘গাঞ্জা রিফাত’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে তাকে গাঁজা, গাঁজা সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং গাঁজা সেবনে ব্যবহৃত একাধিক কল্কিসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত জব্দ করা হয়েছে। পরে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে খিলক্ষেত থানায় একটি মামলা করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় জানায়, রিফাত ইসলাম নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকার জামতলার খ-১১৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা। তার বাবা মো. বাবুল মিয়া, যিনি ‘লইরা বাবুল’ নামে পরিচিত এবং মা রাশিদা বেগম।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রিফাত দীর্ঘদিন ধরেই নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা ও আশপাশের এলাকায় ‘গাঞ্জা রিফাত’ নামেই পরিচিত। তাদের অভিযোগ, তিনি শুধু গাঁজা বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বরং এলাকায় মাদকসেবীদের একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। প্রকাশ্যে মাদক সেবন, নির্জন স্থানে আড্ডা এবং নতুনদের মাদকের দিকে আকৃষ্ট করার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে উঠেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রিফাত নিজের বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর ও তরুণদের নিয়ে মাদকের আসর বসাতেন।
স্থানীয়দের দাবি, নতুনদের গাঁজা সেবনে উৎসাহিত করা, কীভাবে গাঁজা প্রস্তুত ও সেবন করতে হয় সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া এবং ধীরে ধীরে তাদের মাদকাসক্ত করে তোলার মতো কর্মকাণ্ডেও তিনি জড়িত ছিলেন। এসব কারণে বহু পরিবার তাদের সন্তানদের চলাফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। অনেক অভিভাবক সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করতেন বলেও জানান।

স্থানীয়দের দাবি, রিফাতের বিরুদ্ধে মাদকের অভিযোগই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট খিলক্ষেত থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা মামলায়ও তার নাম রয়েছে। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭, ৩৮৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া মব সৃষ্টি, বাড়িঘরে হামলার চেষ্টা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। 

এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানায়, নিকুঞ্জ টানপাড়া একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। সেখানে প্রকাশ্যে মাদকের আসর বসা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, একজন মাদক ব্যবসায়ী কখনো একা কাজ করেন না, তার পেছনে একটি চক্র থাকে। তাই কেবল একজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বরং পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যেন আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই দাবিও জানান তারা।

খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানায়, মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, শুধু মাদক উদ্ধার নয়, এর সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।

খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। নিকুঞ্জ, টানপাড়া, জামতলা ও সমগ্র খিলক্ষেত এলাকায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা মাদক ব্যবসা করবে, মাদক সেবনের আসর পরিচালনা করবে কিংবা তরুণ সমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওসির এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন নিকুঞ্জ টানপাড়া ও জামতলার বাসিন্দারা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময় খিলক্ষেত থানা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে এলাকায় মাদক কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার কারণে প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও কেনাবেচার প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে বলে তারা মনে করেন। তবে তাদের প্রত্যাশা, এই অভিযান যেন সাময়িক না হয়ে নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকে এবং মাদকচক্রের মূল হোতা, সরবরাহকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও একইভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন অভিযানই পারে তরুণ সমাজকে এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে।

নিকুঞ্জ টানপাড়া ও জামতলার বাসিন্দারা জানায়, খিলক্ষেত থানার বর্তমান ওসি সোহরাব আল হোসাইনের নেতৃত্বে মাদকের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং মাদকের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। 

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা এবং সমগ্র খিলক্ষেত এলাকাকে মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসিক এলাকায় পরিণত করা সম্ভব হবে।