সেই হরিদাস অর্থ পাচার মামলায় গ্রেপ্তার, রিমান্ড

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর সেই আলোচিত হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে (৪৫) অর্থ পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত রবিবার রাতে জেলা পুলিশের সহযোগিতায় ঢাকার সিআইডির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে পলাশবাড়ীর নয়াপাড়া গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাইবান্ধা পুলিশ সুপার জসিম উদ্দীন। গ্রেপ্তারের পর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পলাশবাড়ীতে রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোক্তা হিসেবে আলোচনায় আসেন এই হরিদাস।  পুলিশ সুপার বলেন, হরিদাসের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরার পশ্চিশ থানায় মানিলন্ডারিং মামলা রয়েছে। হরিদাস তার অ্যাকাউন্টে ১০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করেছেন। এসব টাকার কোনো বৈধ উৎস নেই। সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার হরিদাসকে আদালতে হাজির করে অর্থ পাচারের মামলায় সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেন চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

রিমান্ড শুনানির সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে হরিদাস বলেন, ‘আমি একজন কৃষক ছিলাম, এখন মন্দির পরিচালনা করি। মন্দির করে যদি অপরাধী হই তাহলে কিছু করার নেই। ভক্তদের দেওয়া এ টাকা যদি অন্যায় কাজে পরিচালনা করি তাহলে সেটা তদন্ত করা হোক।’

হরিদাস চন্দ্রকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘বেশ কিছুকাল ধরে যে উগ্র সাম্প্রদায়িক মহল মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে এসেছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে, সারা দেশজুড়ে অহেতুক ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নিয়ে সাম্প্রদায়িক হুমকির শিকার হরিদাসকে গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক ও অগ্রহণযোগ্য এবং তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।’ সংগঠনটি অবিলম্বে হরিদাসের মুক্তির দাবি জানিয়েছে।

জানা যায়, বিভিন্ন অফিসার, মন্ত্রীর ভুয়া পরিচয়ে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ২০২২ সালের  ৮ নভেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। সেই মামলায় জামিন নিয়ে তিনি পালিয়ে দেশের বাহিরে চলে যান। এ নিয়ে ওই বছর দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।  ২০২৪’র গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে মূর্তি ও ধর্মের নামে নানা ধরনের প্রতারণা শুরু করেন এলাকায়।

এ ছাড়া হরিদাস চন্দ্র সনাতন ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি নিজেকে ‘তাওহিদ ইসলাম’ বলে পরিচয় দেন এবং সুমি বেগম নামের একজনকে বিয়ে করেন। সম্প্রতি তিনি এলাকায় এসে সনাতন ধর্মের লোক বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। ধর্মের আড়ালে নানা অপকর্ম করেছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

এক সময়ে সংসারে অভাবের কারণে বাঁশের ডালি, কুলা, চালুনি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন হরিদাস। তার বাড়ি পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর নয়াপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম গোপিনাথ চন্দ্র তরণী। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে হরিদাস চতুর্থ।

গতকাল সোমবার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হরিদাস এর আগে অবৈধভাবে ভারত গিয়ে সেখান থেকে ২০১০ সালের দিকে বাংলাদেশে আসেন। ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তিনি তাওহি ইসলাম নাম ধারণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের সম্পাদিত (এডিট করা) ছবি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে সংরক্ষিত ভুয়া ফোনকল প্রদর্শন করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডি জানায়, সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বদলি, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তার কোনো বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে মোট ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, যা সন্দেহজনক বলে মনে করছে সিআইডি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে। তার বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাবে হওয়া সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি তার ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েছেন, যা তার পেশা ও পরিচিত আয়ের উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বনানী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলাও রয়েছে।