প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস জনগণ। তাই জনগণের সমর্থন যতক্ষণ থাকবে এবং জনগণ যতক্ষণ পাশে থাকবে, বিএনপি কোনো বাধাই মানবে না। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কদিন আগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে এ দেশ থেকে স্বৈরাচার হটিয়েছি। এবার আসুন সবাই মিলেমিশে দেশের জন্য কাজ করি। আমরা এই দেশটাকে পুনর্গঠন করতে চাই, সামনে এগিয়ে নিতে চাই। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দেশটাকে একদিন সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব, ইনশা আল্লাহ।
গতকাল সোমবার এক দিনের সফরে বরিশাল আসেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে তিনি গৌরনদী উপজেলা ও বরিশাল নগরীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন, সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ পরিদর্শন করেন এবং বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে একটি সাংগঠনিক সভায় যোগ দেন।
গতকাল সকালে রাজধানীর গুলশানের বাসভবন থেকে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নে নবখননকৃত সরিকল-বাটাজোর খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে তিনি বলেন, ২০০৪ সালের পর দীর্ঘ বিরতির পর আবার এই এলাকায় এসেছেন। খাল পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে তিনি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন, পরে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তা এগিয়ে নিয়েছিলেন।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত গাছ নেই। এ কারণে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু চারা রোপণ নয়, সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যারও আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, একটি শিশুকে যেভাবে যতেœ বড় করে তুলতে হয়, গাছকেও ঠিক সেভাবেই পরিচর্যা করতে হবে।’ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ জনগণের। নিজের বাড়িঘর যেমন পরিচ্ছন্ন রাখা হয়, তেমনি দেশকেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সবার দায়িত্ব। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে খাল-নালা ভরাট না করার আহ্বান জানান তিনি। ব্যবহৃত টিস্যু বা আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলারও পরামর্শ দেন।
পরে একই স্থানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের নারী প্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, গৌরনদীতে এরই মধ্যে ছয় শতাধিক পরিবার এ কার্ড পেয়েছে। যেসব পরিবার এখনো কার্ড পায়নি, তাদেরও পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
দুপুর ২টার দিকে বরিশাল নগরীর ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি এলাকায় সাগরদী খালের পাড়ে দ্বিতীয় দফায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে খালের দুই পাড়ে প্রায় ৩৫০টি চারা রোপণ করা হয়। তিনি বলেন, গাছ লাগানোর পাশাপাশি তার নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এলাকাটি ছায়াময় ও পরিবেশবান্ধব জনপরিসরে পরিণত হয়।
সাগরদী খালকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জলাধার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয়; স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। তিনি খালে প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য না ফেলার আহ্বান জানান এবং খালপাড়ে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সিটি করপোরেশনকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির পয়োনিষ্কাশনের লাইন সরাসরি খালে সংযুক্ত না করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মতো পরিবেশ সংরক্ষণেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান তিনি।
দিনের শেষ কর্মসূচিতে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে একটি সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভা শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে বরিশাল ত্যাগ করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে বরিশালে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ঐক্যের চিত্র দেখা যায়। বরিশাল জেলা ছাড়াও বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে ফুল ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানান তারা এবং বিভিন্ন সেøাগানে মুখর করে তোলেন পুরো পথ। পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরাও বর্ণিল সাজ-পোশাকে অংশ নিয়ে সফরকে উৎসবমুখর করে তোলেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২২ বছর পর তারেক রহমান গৌরনদীতে পা রাখলেন। সবশেষ ২০০৩ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এ উপজেলা সফর করেছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে প্রথমবারের মতো বরিশাল সফর করেন তারেক রহমান। এর আগে সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারণার অংশ হিসেবে ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশাল এসেছিলেন তারেক রহমান। তিনি ওই দিন বেলস পার্কে দলের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন।
সেনা প্রশিক্ষণ পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর : গৌরনদী থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে বাবুগঞ্জের রহমতপুরে সেনাবাহিনীর সাত পদাতিক ডিভিশন ও বরিশাল এরিয়ার গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ-২০২৬ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাকে স্বাগত জানান সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সাত পদাতিক ডিভিশন ও বরিশাল এরিয়ার কমান্ডার মেজর জেনারেল এম খায়ের উদ্দীন।
প্রশিক্ষণ পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগত অনুশীলন, মৌখিক আদেশ প্রদান পদ্ধতি এবং বিভিন্ন আধুনিক সমরপ্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন। সেনাসদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নৌকা কাত হয়ে কয়েকজন নদীতে : প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও সাংগঠনিক সভায় অংশ নিতে হিজলা উপজেলা থেকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে আসা একটি লঞ্চ গতকাল সকাল ১০টার দিকে ডুবোচরে আটকে পড়ে। পরে যাত্রীদের তীরে নামানোর সময় জোয়ারের ঢেউ ও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এক পাশে কাত হয়ে কয়েকজন যাত্রী পানিতে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে পানির গভীরতা হাঁটুসমান হওয়ায় সবাই নিরাপদে তীরে উঠে আসেন। ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনায় ‘নৌকাডুবি’ খবর ছড়িয়ে পড়লেও তা ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে প্রশাসন। নৌপুলিশ জানিয়েছে, কোনো হতাহত বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি।