আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

ইইউ কেন ইসরায়েলি অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্য কমাতে চায়?

অধিকৃত পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সোমবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ নিয়ে মতবিনিময় হয়। তবে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও সদস্য দেশগুলোর সমর্থনের মাত্রা যাচাই করাই ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।

বৈঠকের শুরুতে ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি ‘একেবারেই অসহনীয়’। তার ভাষায়, সেখানে যা ঘটছে, তা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে দিন দিন আরও কঠিন করে তুলছে।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইউরোপীয় কমিশনের একটি গোপন নথির ভিত্তিতে তিনটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এগুলো হলো—অবৈধ বসতি থেকে আমদানির জন্য বিশেষ লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু, উচ্চহারে শুল্ক আরোপ অথবা এসব বসতি থেকে আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।

তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ২৭ সদস্যের ইইউর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন না।

দ্রুত বাড়ছে অবৈধ বসতি

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে। পূর্ব জেরুজালেম বাদে এই অঞ্চলে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করছেন। অন্যদিকে সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন।

চলতি মাসেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলে নতুন ১৩টি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।

ফিলিস্তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাদার–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে আটটি নতুন বসতি স্থাপন করা হলেও ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২টিতে। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৬২টি এবং ২০২৫ সালে পৌঁছায় ৮৬টিতে।

অন্যদিকে, সশস্ত্র সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি–এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক নাসের খাদুর জানান, ২০২৬ সালে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও কৃষি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, গাছ উপড়ে ফেলা, কৃষিজমি দখল এবং গবাদিপশু ও কৃষিপণ্য লুটের মতো ঘটনা ঘটছে।

চাপের মুখে ইইউ

অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সদস্য দেশগুলোর চাপের মুখে গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কমিশন বাণিজ্য সীমিত করার বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরে।

কাজা কালাস বলেন, অনেক সদস্য দেশ অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে। এখন দেখা হবে, কমিশনের প্রস্তাবগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে কতটা সমর্থন পায়।

বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো বলেন, বর্তমান প্রস্তাবগুলো বাস্তব পদক্ষেপের চেয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবেই বেশি মনে হচ্ছে। তার মতে, এখন সময় এসেছে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ২৭টি সদস্য দেশের সর্বসম্মত সমর্থন লাগবে, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটই যথেষ্ট হবে—এ নিয়েও ইইউর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, জার্মানি ও ইতালির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

ইইউর আগের অবস্থান

স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডসহ কয়েকটি ইইউ সদস্য দেশ ইতোমধ্যেই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্যে নিজস্ব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

গত মে মাসে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গুরুতর ও ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চারটি প্রতিষ্ঠান ও তিনজন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক পরামর্শমূলক মতামতে জানায়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। একই সঙ্গে এসব বসতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে—এমন বাণিজ্য বা বিনিয়োগ সম্পর্ক এড়াতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানায় আদালত।

তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার গত বছর আইসিজের ওই মতামত বাস্তবায়নের উদ্যোগকে 'লজ্জাজনক' বলে মন্তব্য করেছিলেন।