ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের বাড়ি কেড়ে নিচ্ছে দখলদার ইসরায়েলিরা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

ফিলিস্তিনি নাগরিক মোহাম্মদ সালামাহ তার পরিবারের জন্য ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে একটি বাড়ি নির্মাণ করছিলেন। তার সদ্য বাগদান সম্পন্ন হওয়া ছেলেটির বিয়ের পর এই বাড়িতেই সংসার শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী একটি দল বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করে নেয়।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ধারণ করা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স কর্তৃক যাচাইকৃত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত দুই তলা বিশিষ্ট ওই বাড়ির ছাদে অন্তত ছয়জন সেটলার ঘোরাঘুরি করছে।

সালামাহ জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং পুলিশের কাছে বারবার আকুতি জানিয়েও কোনো সাহায্য মেলেনি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অন্যান্য বহু বাড়ির মতোই তার বাড়িটিও ইসরায়েলি বসতি ও ছোট ছোট পাহারা চৌকি দিয়ে পরিবেষ্টিত। এখন তার আশঙ্কা, বাড়িটি হয়তো চিরতরে হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং ওই এলাকার অন্য বাড়িগুলোর ভাগ্যও একই রকম হতে পারে।

সালামাহ বলেন, 'কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন, যদি আইন ও শৃঙ্খলা থাকত, তবে তারা চলে যেত। তারা যদি একটি বাড়ি দখল করতে সফল হয়, তবে বাকিগুলোও একে একে তাদের দখলে চলে যাবে।

রয়টার্স জানায়, এই বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে মন্তব্যের জন্য অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গত বৃহস্পতিবারও তাদের একজনকে বাড়ির ছাদে হাঁটতে দেখা গেছে। এই ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধের জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তবে শুক্রবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ইসরায়েলি পুলিশও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

নেতানিয়াহু সরকারের অধীনে বসতি স্থাপন ও হামলা বৃদ্ধি

পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের জমি দখল একটি দীর্ঘদিনের সাধারণ চিত্র। সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ ইসরায়েলি বসবাস করে।

ফিলিস্তিনিরা বছরের পর বছর ধরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে তাদের কৃষিজমির ক্ষতিসাধন, ভাঙচুর এবং বসতি সম্প্রসারণের সাথে জড়িত হামলার কথা জানিয়ে আসছে। গত মাসে জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনি গ্রাম এবং কৃষিজমিতে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার হার প্রায় ১৩০%।

জালুদ গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, চলতি সপ্তাহের এই ঘটনাটি একটি নতুন ও উদ্বেগের মোড় নিয়েছে। কারণ এবার অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এমন একটি বাড়ি দখল করেছে যা তখনো নির্মাণাধীন ছিল।

গ্রাম কাউন্সিলের প্রধান রায়েদ আল-হাজ মোহাম্মদ বলেন, 'তারা এখন জালুদ গ্রামের সর্বশেষ বাড়িটি থেকে মাত্র ১০০ মিটারেরও কম দূরত্বে চলে এসেছে। সেটিও এক বাসিন্দার নির্মাণাধীন বাড়ি।'

তিনি আরও জানান, জালুদ গ্রামটি এ পর্যন্ত পাঁচটি বড় ধরনের অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর এবং গাছপালা উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও বর্তমান পরিস্থিতি

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং জাতিসংঘ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে গণ্য করে। তারা এক্ষেত্রে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের কথা উল্লেখ করে, যেখানে দখলকৃত ভূখণ্ডে দখলদার দেশের বেসামরিক জনসংখ্যা স্থানান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে আসছে যে, পশ্চিম তীর একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড এবং সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিদের উপস্থিতি রয়েছে।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

বসতি নির্মাণ এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।

তা সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের অধীনে বসতি সম্প্রসারণের গতি আরও তীব্র হয়েছে। কারণ তার সরকার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে কট্টরপন্থী বসতি-সমর্থক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

মোহাম্মদ সালামাহর জন্য এই ক্ষতি অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং বেদনাদায়ক। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার ছেলে কাজ হারিয়ে ফেলেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ায় বাড়িটির নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল।

হতাশা প্রকাশ করে সালামাহ বলেন, 'আমাদের পাশের প্রতিবেশীও একটি দুই তলা বাড়ি বানিয়েছেন। আমরা যদি এই বাড়িটি হারাই, তবে সম্ভবত তারা সেটিও কেড়ে নেবে। আমাদেরটা গেলে তাদের বাড়িটিও তারা হারাবে।'

 

  • আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অবলম্বনে
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত