সৌদি-হুতি যুদ্ধবিরতির অবসান

২০২২ সালের মার্চ মাসে হুতিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পর দুই পক্ষের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে চার বছরের বেশি সময় পর সে সমঝোতা ভেঙে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। গত সোমবার সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের চালানো বোমাবর্ষণের জবাবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি তথ্য উঠে এসেছে। হুতিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের বিষয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সমর্থন দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। সৌদি ও হুতিদের পাল্টাপাল্টি হামলা পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে।

হুতিদের এই হামলা ছিল ২০২২ সালের পর সবচেয়ে মারাত্মক আন্তঃসীমান্ত উত্তেজনা। এই ঘটনা দুই পক্ষের মধ্যে গত চার বছর ধরে চলা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণের পার্বত্য অঞ্চলের প্রাদেশিক রাজধানী আবহার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটিতে অনেক সৌদি নাগরিক গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে বেড়াতে যান। একই সঙ্গে তারা বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা যেন সৌদির আকাশসীমা ব্যবহার না করে। তবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেছেন, হুতি মিলিশিয়াদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সৌদি আরব মাঝ আকাশেই প্রতিহত করেছে।

হামলার আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে অবহিত করা এবং তার সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, সৌদিরা হুতিদের সঙ্গে একটি বড় ধরনের সংঘাতের বিষয়ে বেশ উদ্বিগ্ন, যেখানে তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের প্রয়োজন পড়বে। গত সপ্তাহে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানায় এবং হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার জন্য ওয়াশিংটনের সমর্থন চায়। এর পর বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর একদিন পর রুবিও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এর পরপরই শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। ওই ফোনালাপে মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চান এবং ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। এই বিষয়ে হোয়াইট হাউজের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা ফক্স নিউজের সঙ্গে ট্রাম্পের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে ট্রাম্প ইরানের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তবে ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাস মন্তব্যের অনুরোধে কোন সাড়া দেয়নি।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় যখন ইরানের মাহান এয়ারের এর একটি বিমান হুতি নিয়ন্ত্রিত সানা শহরে অবতরণ করে। বিমানটি হুতি নেতাদের একটি প্রতিনিধিদলকে নিয়ে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য তেহরান রওনা হয়েছিল। হুতিরা দাবি করেছিল, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ওই ইরানি বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান থেকে সানায় কোনো ফ্লাইট পরিচালিত না হওয়ায় এটি ছিল অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। গত সোমবার হুতি প্রতিনিধিদলকে নিয়ে ইরানি বিমানটি যখন ইরান থেকে ফিরে আসছিল, ঠিক তখনই সৌদি সামরিক বাহিনী সানা বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করে। এর ফলে বিমানটি পথ পরিবর্তন করে লোহিত সাগর উপকূলের আল হুদাইদা-তে অবতরণ করতে বাধ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, মাহান এয়ার মূলত আইআরজিসি (ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস)-এর বিমান সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তার দাবি বিমানটি হুতিদের জন্য অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের বহন করছিল।