দুই পাহাড়ের মধ্যে ছিল ফরেস্ট মনেস্ট্রি মে হং সন। প্রধান সড়ক থেকে প্রায় দুই-তিন কিলো ভেতরে। শুরুতে একটা রাজকীয় গেইট আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে। এই গেইটের ভেতর দিয়ে একবার প্রবেশ করলে শান্তি আপনার হ্রদয় ছুঁয়ে যাবে। বিশাল খোলা মাঠ। সবুজ ঘাসে ঢাকা। গাছগাছালিতে ভরপুর। অচেনা হলুদ ফুল, নানা রঙের বাগানবিলাস। পাহাড়ের গায়ে ঝুলছে অর্কিড। তারেই ফাঁকে ফাঁকে কাঠের ছোট কুটির। ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা থাকার কুটির। মেডিটেশন হল। লাইব্রেরি। ডাইনিং হল। বনের ভেতর ছোট একটা নদী। একেবেঁকে চলে গেছে মনেস্ট্রির ভেতর দিয়ে। নদীর পাড়ে বেঞ্চ পাতা। বসার ব্যবস্থা। বই পড়া যায়। ধ্যান করা যায়। অথবা কিছু না করে শুধু বসে থাকলে দারুণ লাগে।
জায়গাটা হলো উত্তর থাইল্যান্ডে। এই ফরেস্ট মনেস্ট্রিতে আছে, একটা ছোট ঝরনা। পানির ফোয়ারা। দুটো গুহা, মংকদের বিশ্রামগার, সবজি বাগান। লেক (তাতে বড় বড় মাছ, যেহেতু সবাই নিরামিষভোজী)। তাই কেউ মাছ খায় না। মাছগুলো দিনে দিনে বড় হচ্ছে।
খুব ভোরে আমাদের ক্লাস শুরু হতো। ভোর সাড়ে ৩টায়। তারপর মেডিটেশন, ক্লাস, আহার, বাগানে হেঁটে বেড়ানো (এক ধরনের মেডিটেশন)। বিকেলে ছিল অবসর। আমি লেকের পাড়ে বসে, বই পড়তাম। ছবিযুক্ত চমৎকার বই। অনেকটা কমিকস বইয়ের মতো। ছবি বেশি, লেখা কম। পড়তে আরাম। সুন্দর সুন্দর শব্দ, আর দারুণ ইলাসস্ট্রেশন, রঙের ব্যবহার আরও আকর্ষণীয়। এখানে এসে আমি দুটো বই উপহার হিসেবে পেয়েছি। মাছগুলো ভেসে উঠে শেওলা খাচ্ছে। আবার ডুবে যাচ্ছে অগভীর জলে। । আমি মাছগুলোর চোখ দেখতে পাচ্ছি এখন। ওরা আমার চোখে চোখ রেখে আরাম করে শ্যাওলা খাচ্ছে।
সামনের পাহাড়ের চূড়াটি অনেক উঁচু। আকাশে গিয়ে ঠেকেছে যেন। আমি লেকের পাড়ে, চূড়াটির বিপরীতে বসে আছি। শেষ বিকেলের আলো লেগেছে তাতে। পাহাড় চূড়াটি সারা শরীর সবুজ, তাতে লাল লাল ফুল, নাম না জানা অর্কিড ঝুলছে। মাথায় সূর্যের সোনালি আলো মুকুটের মতো লাগছে। হাতের বই নামিয়ে রেখে আমি মিলিয়ে যাওয়া বিকেল দেখছি।
আমার দিন যায়, রাত আসে। মংকদের পিতলের ঘণ্টায় আমার ঘুম ভাঙে। কিন্তু বারের হিসাব কে রাখে? আমার থাকার ঘরটি নদীর পাড়ে, সারা রাত পানি গড়িয়ে যাওয়ার সমধুর কলতান। আমাকে আধো জাগরণ, আধো আলোড়নে রাখে। আমি খুব ভোরে শিশির মাখা ঘাসে খালি পায়ে হেঁটে যাই। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাখিদের গান শুনি। ঝরাপাতা আমার গায়ে খসে পড়ে।
আমাকে দেওয়া হলো, সাদা কুর্তি ও পায়জামা। সবারই একই পোশাক। ছেলে-মেয়ে সব আজ একাকার। খুব মিহি নরম একটা কম্বল, একটা বালিশ, দুটো বই নিয়ে আমাকে আমার কুটির বুঝিয়ে দিল। আমি নদীর পাড় ধরে হেঁটে পাহাড়ের দিকে চলে এলাম। তারপর পাথর দিয়ে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। আমি খালি পায়ে অমসৃণ পাথরে পা ফেলে গুহার মুখে চলে এলাম। মাথার ওপর পাথর ঝুলছে। মনে হচ্ছে ভেঙে পড়বে এক্ষুনি। জায়গাটা অতি নির্জন। গম্ভীর। পাশে মোমবাতি। ধূপকাঠি। পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ফোকর। কয়েকটা বই, নানান অচেনা জিনিস রাখা। আমার কিছুটা ভয় হতে লাগত। এখানে মংকেরা বসে দিনের পর দিন ধ্যান করে। আমি নিজেকে তাদের জায়গায় নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু পারলাম না। এখানে ইন্টারনেট নাই। বাইরের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই। আমাদের বলা হলো, তোমাদের কোনো কিছু দরকার হলে, আমরাই সব করে দেব। এক সঙ্গে আমরা ছিলাম দুইশ জন। সবাই প্রায় ককেশীয়। কিছু চীনা, জাপানিজ আছে। একমাত্র আমি ধূসর। এখানে কারও সঙ্গে কারও কথা বলার হেতু নেই। আমার আর কথা বলা হয়নি। তাদের সঙ্গে।
আজ আমাদের ফেরার পালা। আমরা শহরে চলে যাব আজ। সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নিচে এলো। পাশেই গাড়ি অপেক্ষা করছে। শহর এখান থেকে আড়াই-তিন ঘণ্টার পথ। আমি কুর্তি-পায়জামা বদলে শহুরে পোশাক পরে নিলাম। অন্যদের সঙ্গে এসে রিসেপশনে যোগ দিলাম। তিনি এলেন। প্রধান মংক। থাইল্যান্ড মংকদের প্রধান। বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি। আমাদের খোঁজখবর নিলেন। কেমন লাগেছে জানতে চাইলেন।
আমারা সবাই ফ্লোরে পদ্মাসনে বসে আছি। তিনি একটা কাঠের গুঁড়িতে, ওপরে বসে আছেন। গায়ে বাসন্তি রঙের মংকদের বিশেষ পোশাক। পুরো হলে নীরবতা। হলুদ সোনালি আলোয় ভরে গেছে। খোলা হলের পাশে অনেকগুলো কাঠ জাতীয় ফুল গাছ। গাছ যত বড়, ফুল তত ছোট। সেখান থেকে টুপ টুপ করে ফুল ঝরে পড়ছে সকালের বাতাসে। আমাদের সবাইকে গলায় পরিয়ে দিলেন একটা করে পেনডেন্ট। মেয়েদের দিলেন হাতে। তাতে মনেস্ট্রির নাম লিখা। আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, মংক হও।
আমি বললাম, কিন্তু আমি তো ভ্রমণকারী হয়েছি। তিনি ঈষৎ হাসি দিয়ে বললেন, সে একই কথা।