গোলাপির মোহে ফ্যাশন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

ফ্যাশনের ধারা পরিবর্তনশীল। একেক সময় একেক রঙ মানুষের মন জয় করে নেয়, আর সেটা হয়ে ওঠে ট্রেন্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এখন রঙের ট্রেন্ডে জায়গা নিয়েছে পিংক যাকে বলে গোলাপি। একসময় গোলাপি রঙ শুধু নারীদের রঙ হিসেবেই ভাবা হতো। কিন্তু এখন এই রঙের ব্যবহার অনেক বিস্তৃত হয়েছে। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, লেহেঙ্গা, ওয়েস্টার্ন পোশাক, হিজাব, ব্যাগ, জুতা থেকে শুরু করে মেকআপের বিভিন্ন উপকরণেও গোলাপির নানা শেড জনপ্রিয় হয়েছে। ফ্যাশনে গোলাপির ট্রেন্ড নিয়ে লিখেছেন নাহিন আশরাফ

ফ্যাশন ও সৌন্দর্যের জগতে বর্তমানে পিংক টোন এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে। শাড়ি থেকে সালোয়ার-কামিজ, দৈনন্দিন সাজ থেকে উৎসবের মেকআপ সব ক্ষেত্রেই পিংকের ছোঁয়া চোখে পড়ছে। কোমলতা, সৌন্দর্য, আধুনিকতা ও আত্মবিশ্বাসের মিশেলে পিংক আজ কেবল একটি রঙ নয়, বরং সমকালীন ফ্যাশনের অংশ। তাই বলা যায়, বর্তমান ফ্যাশন দুনিয়ায় পিংকের জয়যাত্রা দিন দিন আরো বিস্তৃত হয়েছে।

কেন গোলাপি রঙের জনপ্রিয়তা

রঙ মানুষের মন ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গোলাপি এমন এক রঙ, যা কোমলতা, ইতিবাচক, ভালোবাসা এবং আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি তৈরি করে মানুষের মনে। আধুনিক ফ্যাশনে এখন আর খুব বেশি উজ্জ্বল বা গাঢ় রঙের চেয়ে নরম ও চোখের আরামদায়ক রঙের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। গোলাপি সেই চাহিদা পূরণে ষোলআনা সক্ষম। কারণ গোলাপির আছে নানা ধরনের শেড। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলাপির বিভিন্ন শেড বা আভা বিভিন্ন বয়স ও ব্যক্তিত্বের মানুষের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। তাই এই রঙ শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বজনীন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

শাড়িতে গোলাপির আধিপত্য

ফ্যাশন বাজারে গোলাপি রঙের শাড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জামদানি, কাতান, অর্গানজা, সিল্ক কিংবা লিনেন সব ধরনের শাড়িতেই দেখা যাচ্ছে গোলাপি  রঙের উপস্থিতি। বিশেষ করে প্যাস্টেল পিংক, ব্লাশ পিংক এবং ডাস্টি রোজ শেডের শাড়িগুলো মেয়েদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। গায়ে হলুদ, বৌভাত-পূর্ব অনুষ্ঠান, জন্মদিন, করপোরেট অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব সব জায়গাতেই পিংক শাড়ি পছন্দে জায়গা করে নিয়েছে। অনেকেই এখন প্রচলিত লাল বা মেরুনের পরিবর্তে বিয়ের বিভিন্ন আয়োজনে গোলাপি রঙের পোশাক বেছে নিচ্ছেন। ফলে  গোলাপি ধীরে ধীরে বিয়ের কনের পোশাকেও জায়গা নিচ্ছে। গোলাপি রঙের শাড়ির বড় সুবিধা হলো সববয়সীদের সমানভাবে মানিয়ে যায়। যেকোনো গায়ের রঙের নারীই এই রঙের শাড়ি পরতে পারবেন।

কামিজে, টপসে নতুন মাত্রা

গোলাপি রঙের সুতি, লন, ভিসকজ কিংবা সিল্কের সালোয়ার-কামিজ বা টপস ফ্যাশন ট্রেন্ডে জায়গা করে নিয়েছে। হালকা গোলাপি রঙ অফিসগামী নারীদের কাছে যেমন গ্রহণযোগ্য, তেমনি গাঢ় গোলাপি বা গোলাপি ম্যাজেন্টা রঙ উৎসবমুখর পরিবেশে এমন রঙের পোশাক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। এছাড়া পিংকের সঙ্গে সাদা, সিলভার, গোল্ডেন বা সবুজ রঙের সমন্বয় পোশাকে এনে দিচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। ফলে এই রঙ সহজেই আধুনিকতা ও ট্রেন্ডের মিলমিশে নতুন লুক তৈরি করা যায় সহজেই। হালকা গোলাপি শেডের পোশাকগুলো স্নিগ্ধতা এনে দেয়।

মেকআপে পিংক টোনের প্রভাব

শুধু পোশাক নয়, মেকআপ ট্রেন্ডেও পিংক এখন জনপ্রিয় রঙ। কয়েক বছর আগে যেখানে ব্রাউন বা নিউড টোন বেশি দেখা যেত, সেখানে এখন পিংক-বেইজ, রোজ পিংক এবং পিচি পিংক টোনের ব্যবহার বেড়েছে। ব্লাশ, লিপস্টিক, আইশ্যাডো এবং এমনকি হাইলাইটারেও পিংকের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘সফট গ্ল্যাম’ ও ‘নো-মেকআপ মেকআপ’ লুকের জন্য পিংক টোন বেশ উপযোগী। মেকআপ আর্টিস্টদের মতে, পিংক মুখে স্বাভাবিক সতেজতা ও উজ্জ্বলতা এনে দেয়। ফলে অতিরিক্ত ভারী  মেকআপ না দেখিয়েও সুন্দর ও পরিপাটি লুক তৈরি করা সম্ভব হয়।

এক্সেসরিজে গোলাপির ছোঁয়া

পোশাকের পাশাপাশি এক্সেসরিজে গোলাপির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট অনুষঙ্গের এই রঙিন উপস্থিতিই কখনো একটি সাধারণ সাজকে অসাধারণ করে তোলে।

 গোলাপি রঙের কানের দুল মুখাবয়বে এনে দেয় সতেজ লুক। কানের দুলের পাশাপাশি একই রঙের আংটি বা ব্রেসলেটে নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। হাতে গোলাপি টোট ব্যাগ কিংবা ক্লাচ থাকলে একরঙা পোশাকও মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পাওয়া যায়। অন্যদিকে গোলাপি স্নিকার, স্যান্ডেল বা হিল কেবল  চোখের আরামই নয়, ব্যক্তিত্বেও যোগ করে সাহসী লুক।  যারা একটু ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান, তারা গোলাপি ঘড়ির স্ট্র্যাপ, হেয়ার ক্লিপ, সানগ্লাসের ফ্রেম বা স্কার্ফের মতো এক্সেসরিজেও রাখতে পারেন এই রঙের ছোঁয়া।

হালকা ব্লাশ পিঙ্ক থেকে শুরু করে উজ্জ্বল ফুশিয়া গোলাপির প্রতিটি শেডেরই রয়েছে আলাদা আবেদন। সাদা, কালো, ধূসর, ডেনিম কিংবা প্যাস্টেল রঙের পোশাকের সঙ্গে এসব এক্সেসরিজ অনায়াসে তৈরি করে নজরকাড়া লুক। বর্তমান ফ্যাশন বলছে, সাজের সৌন্দর্য অনেক সময় নির্ভর করে ছোট ছোট অনুষঙ্গের ওপর। আর সেই অনুষঙ্গ গোলাপি রঙ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

বর্তমান সময়ে ফ্যাশন ট্রেন্ড গড়ে ওঠার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, পিন্টারেস্ট কিংবা টিকটকের বিভিন্ন ফ্যাশন কনটেন্টে পিংক টোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। জনপ্রিয় ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার, মডেল ও তারকারা নিয়মিত পিংক রঙের পোশাক ও মেকআপে উপস্থিত হচ্ছেন। তাদের অনুসরণ করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই রঙের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলোতেও পিংক রঙের পোশাক ও প্রসাধনীর বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিক্রেতারা জানান।

সব বয়সের জন্য উপযোগী

পিংক রঙের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর বহুমাত্রিক ব্যবহার। ছোট শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারী সবার জন্যই পিংকের আলাদা আবেদন রয়েছে। তরুণীরা সাধারণত প্যাস্টেল বা বেবি পিংক পছন্দ করলেও অনেক পরিণত বয়সী নারী ডাস্টি রোজ, মভ পিংক কিংবা গাঢ় গোলাপি শেড বেছে নিচ্ছেন। ফলে পিংক কোনো নির্দিষ্ট বয়সের রঙ নয় বরং এটি একটি সর্বজনীন ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ফ্যাশন ধারা পরিবর্তন হলেও কিছু রঙ দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকে। পিংক সেই সম্ভাবনাময় রঙগুলোর একটি। এর বিভিন্ন শেড, বহুমুখী ব্যবহার এবং সব বয়সের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পিংককে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত