যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান চীন-পাকিস্তানের

হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিও ভেস্তে যাওয়ার মুখে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে অবিলম্বে সামরিক সংঘাত বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার যৌথ আহ্বান জানিয়েছে চীন ও পাকিস্তান।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) চীনের সাংহাইয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দারের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এই আহ্বান জানানো হয়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের নেতাই বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে যুদ্ধ বন্ধের তাগিদ দিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চীনের ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের ইশহাক দার যৌথভাবে বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।’ দুই মন্ত্রীই সব পক্ষকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মেনে চলার আহ্বান জানান।

বৈঠক শেষে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জোর দিয়ে বলেন, আগের কূটনৈতিক অগ্রগতিকে কোনোভাবেই ভেস্তে যেতে দেওয়া যাবে না। গত মাসে হওয়া সমঝোতা স্মারককে "কষ্টে অর্জিত" উল্লেখ করে তিনি সব পক্ষকে এই অগ্রগতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। ওয়াং ই বলেন, ‘শান্তি আমাদের চোখের সামনে; আমরা শেষ মুহূর্তে এসে ছিটকে যেতে পারি না এবং যা অর্জন করেছি তা কোনোভাবেই হারাতে পারি না।’

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। ইশহাক দার মূলত ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্সে যোগ দিতে সাংহাই গিয়েছেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। গত মাসে যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালী ও এর আশেপাশে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে চলা এই সংঘাত নিরসনে চীন ও পাকিস্তান উভয় দেশই মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে।

এই কূটনৈতিক আহ্বানের মধ্যেই শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে। ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় একটি বিমানবন্দর, একটি রেলস্টেশন এবং দুটি সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। তারা আরও কয়েকটি সেতু ধ্বংস করেছে এবং ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের যোগাযোগ টাওয়ার গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালায়, তবে ওয়াশিংটন ইরানের অবকাঠামোতে আঘাত হানবে। সেই হুঁশিয়ারির পরই এই হামলা চালানো হলো। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন হামলায় ডজন খানেক মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। শুক্রবারের হামলার পরও আরও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক মিত্র ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে কাতারও রয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতারও এই সংকটে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিল। নতুন করে এই হামলার ফলে গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং কূটনীতির জায়গা নিয়েছে টানা সামরিক সংঘাত।

নতুন করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য অন্যতম কৌশলগত জলপথ। গত জুনে মার্কিন-ইরান চুক্তির পর জলপথটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে তেহরান ঘোষণা করেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে।

এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আবারও নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, যা পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন ও পাকিস্তানের এই যৌথ বিবৃতি প্রমাণ করে যে, অবিলম্বে আলোচনা শুরু না হলে এই সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে- এমন আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। সব পক্ষকে সমঝোতা স্মারক মেনে চলা এবং সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বেইজিং ও ইসলামাবাদ বার্তা দিয়েছে যে, পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা কয়েক সপ্তাহ আগে অর্জিত ভঙ্গুর কূটনৈতিক অগ্রগতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।

সূত্র: সামা টিভি