কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি একক কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা বা তাদের একক আধিপত্যে চলা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই প্রযুক্তির টেকসই ও সুষম উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শি জিনপিং এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘মানুষ-কেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। চীনের সাংহাইয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির এমন কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শন করা, যা দিয়ে বেইজিং খুব শিগগিরই এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
বর্তমানে কম খরচের কারণে বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তিগুলোর সমকক্ষ হয়ে উঠছে চীনা এআই মডেলগুলো। তবে একই সঙ্গে সামরিক অভিযানে এআই-এর ব্যবহার এবং হ্যাকার ও অপরাধীদের হাতে এর অপব্যবহারের আশঙ্কার মধ্যে এই দ্রুত বর্ধনশীল খাতটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নিজের ভাষণে শি জিনপিং বলেন, নতুন কোনো ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’ যেন তৈরি না হয়, সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই সক্ষমতা বৃদ্ধির সমতা নিশ্চিত করতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এআই-সংক্রান্ত নতুন সুযোগ তৈরি করতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘এআই-এর উন্নয়ন একক কোনো দেশের একক পারফরম্যান্স বা একক অভিনয় হওয়া উচিত নয়, বরং এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক সম্মিলিত সুর (সিম্ফনি)।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এআই-এর ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরিক্ত টেনেহিঁচড়ে বড় করা অথবা অন্য দেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে নিজের দেশের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার যে প্রবণতা, তা আমাদের যৌথভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।’
জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের প্রযুক্তি আমদানির ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এবং মার্কিন এআই গবেষণাগারগুলোর মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে- তা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত মে মাসে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ একটি নোটিশ জারি করে চীনের বাইরে অবস্থিত চীনা কোম্পানিগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ঘোষণা দেয়। ওয়াশিংটনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর বা মূল কোম্পানি চীনে অবস্থিত, তাদের সবার ক্ষেত্রে উন্নত মানের এআই চিপ রপ্তানির জন্য বিশেষ লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে।
শুক্রবারের সম্মেলনে শি জিনপিং পুনর্ব্যক্ত করেন যে, এআই প্রযুক্তির কেন্দ্রে অবশ্যই মানুষকে রাখতে হবে এবং এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে মানুষের হাতেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন আইন-কানুন, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কবার্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা নিশ্চিত করবে যে এআই প্রযুক্তি সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।’
বর্তমানে এআই প্রযুক্তি চীনের শিল্পনীতির একটি কৌশলগত স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকের ব্যবহার পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ দেশীয় ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চীনের সরকারি গণমাধ্যম দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গত দুই বছরে চীনে এআই ব্যবহারের পরিমাপক একক বা ‘টোকেন’-এর দৈনিক ব্যবহার প্রায় এক হাজার গুণ বেড়েছে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অত্যন্ত অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, এআই চিপের মাধ্যমে পরিচালিত বিশাল তথ্যকেন্দ্র বা ‘ডেটা সেন্টার’গুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বেইজিং বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ ডেটা সেন্টারে ১ লাখ পরিবারের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে। অন্যদিকে, পরবর্তী প্রজন্মের বিশালাকার ‘হাইপারস্কেল’ ডেটা সেন্টারগুলোতে প্রায় ২০ লাখ পরিবারের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রাস করতে পারে।
চীন মূলত তাদের প্রচুর এবং সস্তা বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতার কারণে এই বিশাল জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য সবচেয়ে আদর্শ অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। দেশটির বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে বা গ্রিডে সরকারের বড় ধরনের বিনিয়োগের ফলে এই ব্যবধান ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা