পাকিস্তানে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের করাচি শহরের একটি সরকারি হাসপাতালে ভয়াবহ এইচআইভি (এইডস সৃষ্টিকারী ভাইরাস) প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সিংহভাগই শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পাকিস্তানের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, করাচির কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল এবং লান্ধি এলাকার দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্ক্রিনিংয়ের পর অন্তত ১৩০ জনের শরীরে এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শিশু। গত কয়েক সপ্তাহে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সিন্ধুর শ্রমমন্ত্রী সাঈদ ঘানি জানান, সিন্ধু এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত কেবিভি হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ১২০ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া লান্ধি এলাকার অন্য একটি কেন্দ্রে আরও ১০ জন রোগী শনাক্ত হয়। 'সেসি' মূলত প্রদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের শ্রমিক এবং তাদের পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে করাচির সাইট টাউনের বাসিন্দারা প্রথম লক্ষ্য করেন যে, কেবিভি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কিছু শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন স্বাস্থ্য দপ্তরে প্রথম ছয়টি কেস রিপোর্ট করা হয়।

গত ১৪ জুলাই সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দেওয়া দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের ভয়াবহ গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংক্রমণ প্রতিরোধে ন্যূনতম নিয়মকানুন না মানা, সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাব এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহারে চরম অসতর্কতার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।

গত বছরের নভেম্বরের প্রথম তদন্তে কেবিভি হাসপাতালের শিশু বিভাগে ১৬ জন আক্রান্তের খোঁজ মেলে। এরপর গত ১৯ জুন জমা দেওয়া দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে ৭৮ জনের সংক্রমণ এবং ৬ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এই প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের নির্দিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়ী করা হয়েছে।

এই ঘটনায় গত ৩ জুলাই ৩৭ জন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী সাঈদ ঘানি জানিয়েছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নৈতিক দায় স্বীকার করে তিনি প্রয়োজনে পদত্যাগের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তবে হাসপাতালটিতে অটো-ডিজেবল (পুনরায় ব্যবহার অযোগ্য) সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হতো দাবি করে সুই পুনর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। অন্যদিকে, সিন্ধু হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিট পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএনএইডস-এর তথ্যমতে, পাকিস্তানের এইচআইভি পরিস্থিতি বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে। গত ১৫ বছরে দেশটিতে বার্ষিক সংক্রমণ ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে যেখানে বার্ষিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ৪৮ হাজারে।

সংস্থা দুটির হিসাবমতে, পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশেষ করে ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ২০১০ সালের ৫৩০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩ সালে ১,৮০০-তে পৌঁছেছে। আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৩৮ শতাংশ এবং গর্ভবতী নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন।

প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এইচআইভি-তে গত জুনে চিকিৎসকরা লিখেছেন, পাকিস্তানের এই মহামারির অন্যতম মূল কারণ দেশটির ত্রুটিপূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি। করাচির আগাখান বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ ফয়সাল মাহমুদ জানান, অনিরাপদ সিরিঞ্জ ও রক্ত সঞ্চালনের কারণে ক্লিনিকে গিয়ে কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় নজরদারি (সার্ভেইল্যান্স) পাকিস্তানে নেই। তবে এটি যে একটি দেশব্যাপী কাঠামোগত সমস্যা, তা স্পষ্ট। করাচির আরও তিনটি হাসপাতালেও শিশু এইচআইভি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (পিএমএ) সতর্ক করে বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিন্ধুতে রেকর্ড হওয়া ৮৯৪টি কেসের মধ্যে ৩২৯টিই শিশু, যা প্রকৃত সংকটের হিমশৈলের চূড়ামাত্র।

সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য অপসারণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সিন্ধু হাইকোর্ট আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রাদেশিক সরকারকে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিম্নমানের সিরিঞ্জের ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটি অব পাকিস্তান জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সাধারণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হবে। এছাড়া অস্ত্রোপচারের আগে এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সিন্ধু সরকার আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপির (৭.২ মিলিয়ন ডলার) একটি তহবিল অনুমোদন করেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে, যা তদারকি করা অত্যন্ত কঠিন। পাশাপাশি, দ্রুত সুস্থতার আশায় রোগীদের ইনজেকশন নেওয়ার প্রবণতা এবং চিকিৎসকদের অসচেতনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

সূত্র: আলজাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত