চালু হলো চসিকের ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ

সড়ক বাতিটি জ্বলছে না কয়েক দিন ধরে, গলির মোড়ে জমে আছে আবর্জনার স্তূপ কিংবা ড্রেনের নোংরা পানিতে রাজত্ব গড়েছে মশার লার্ভাÑ নগরীতে এমন চেনা দুর্ভোগের মুখোমুখি হলে সাধারণত নগরবাসীর ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। সিটি করপোরেশনের দপ্তরে গিয়ে অভিযোগ জানানোর ঝক্কি তো আছেই। তবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নাগরিকদের জন্য সেই চেনা ছবিটা এবার বদলে দিতে চাচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ। নাগরিক ভোগান্তি আর দাপ্তরিক উদাসীনতার চেনা দেওয়াল ভাঙতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন চালু করেছে ওয়ান-স্টপ সিটিজেন অ্যাপ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’।

গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ আধুনিক অ্যাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়র বলেন, আমরা এমন একটি সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নাগরিককে সেবা পাওয়ার জন্য অফিসে ঘুরতে হবে না; বরং প্রযুক্তিই নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছে দেবে। এটাই স্মার্ট চট্টগ্রাম গড়ার আমাদের অঙ্গীকার। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, এই ডিজিটাল উদ্যোগের ফলে এখন নগরবাসী কেবল মুঠোফোনের এক ক্লিকেই সরাসরি যুক্ত হতে পারবেন নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। এতে বন্ধ হচ্ছে ফাইলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, কমবে সময় আর ভোগান্তি। তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক এই অ্যাপটির প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করেছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভেনটো টেক। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল)।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপটি মূলত একটি স্মার্ট ও নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল সমাধান। গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি নামিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে সহজেই এর নিবন্ধন করা যাচ্ছে। অ্যাপটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর ব্যবহারিক সরলতা। নগরীর যেকোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে রাস্তায় ভাঙা অংশ, মশার উপদ্রব, যততত্র আবর্জনা, পাবলিক টয়লেট, অবৈধ স্থাপনা, জলাবদ্ধতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা দেখলেই ব্যবহারকারী ছবি তুলে, বিভাগ ও এলাকা নির্বাচন করে অভিযোগ জমা দিতে পারবেন।

জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোকেশন যুক্ত হয়ে এ অভিযোগ সরাসরি পৌঁছে যাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তার টেবিলে। নাগরিকরা ঘরে বসেই মুঠোফোনের পর্দায় দেখতে পারবেন তাদের অভিযোগের কাজ কতটুকু এগোল; তা কি ‘চলমান’ নাকি ‘সমাধান হয়েছে’। এই অ্যাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী ফিচার হলো ‘মেয়রের সঙ্গে চ্যাট’। নগরসেবাসংক্রান্ত যেকোনো জরুরি জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ সরাসরি মেয়রকে জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন বাসিন্দারা।

শুধু অভিযোগ জানানোই নয়, হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, জন্ম নিবন্ধন কিংবা রাস্তা কাটার অনুমতির মতো চসিকের গুরুত্বপূর্ণ সব সেবা এখন এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা হয়েছে

বিপদে পড়লে ওয়ান-ক্লিক জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করার পাশাপাশি আগে থেকে সেট করে রাখা নম্বরে নিজের বর্তমান অবস্থান বা লাইভ লোকেশন পাঠানোর সুবিধাও রয়েছে এতে। এছাড়া শহরের কাছাকাছি থাকা হাসপাতাল, থানা, পার্ক বা পাবলিক টয়লেটের মতো জরুরি স্থাপনাগুলো খুঁজে দেবে এই অ্যাপ।

নাগরিকদের এ অভিযোগগুলো যেন দাপ্তরিক ফাইলের নিচে চাপা পড়ে না থাকে, সে জন্য কর্মকর্তাদের ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ‘ওয়ার্ডভিত্তিক হিট ম্যাপ’। এর ফলে কোনো ওয়ার্ডে মশার উপদ্রব বেশি বা কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতার অভিযোগ বেশি আসছে, তা মানচিত্রের রঙের তীব্রতা দেখেই চিহ্নিত করতে পারবেন নীতিনির্ধারকরা।

কাজে গতি আনতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং ও এসকেলেশন সিস্টেম। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা সমস্যার সমাধান না করলে বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরের কর্মকর্তার কাছে চলে যাবে। নাগরিকরা কেবল অভিযোগই নয়, বরং নতুন পরিকাঠামোর প্রস্তাব, পার্ক, খেলার মাঠ কিংবা হাসপাতালের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে অ্যাপের পোলিং সিস্টেমের মাধ্যমে নিজেদের মতামত ও ভোট দিতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্সসহ অধিকাংশ সেবা সম্পূর্ণ অনলাইনে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও জানান, চসিকে দ্রুতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা সংযুক্ত করা হবে। এ ক্যামেরাগুলো রাস্তার পাশে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা ময়লা কিংবা জলাবদ্ধতার মতো নাগরিক সমস্যাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে চসিকের সিস্টেমে অভিযোগ হিসেবে পাঠিয়ে দেবে।