মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী মহাযুদ্ধের কালো মেঘ

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা, সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার কথা থাকলেও, বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র হামলা ও পাল্টাহামলা পরমাণু শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানকে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। গত কয়েকদিনে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে এবং ওমান উপসাগরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে।

সংঘাতের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, তা এখন সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান ও ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সামরিক ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো, যেমন- বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধনাগার, বন্দর, যোগাযোগ সেতু, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। মার্কিন হামলায় ইতিমধ্যে ইরানে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। 

অন্যদিকে, জর্ডানের আল আজরাক এলাকায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা সদস্য নিহত এবং চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া আরও একজন সেনা নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। গত মার্চের পর এই প্রথম ইরানের সরাসরি হামলায় কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।

সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর ইরান এই জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে এটি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও, আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে এর উন্মুক্ত ব্যবহারের দ্ব্যর্থবোধক ব্যাখ্যা চুক্তিটিকে দুর্বল করে দেয়। এরপর জুন মাসের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে মার্কিন বাহিনী ইরানের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। ওয়াশিংটন বহু বছর পর আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারে ইরানের তেল বিক্রির যে ছাড় দিয়েছিল, তা-ও বাতিল ঘোষণা করেছে। তেহরান একে চুক্তি লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকে তাদের অলঙ্ঘনীয় 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সম্পৃক্ততা। ইরান তাদের এই মিত্র বাহিনীকে লোহিত সাগরের জ্বালানি পরিবহন পথ বন্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির নৌপথ যদি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এক অভূতপূর্ব দ্বিমুখী অবরোধের মুখে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তখন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতিতে সরাসরি বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোটেল বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সংঘাতটি কোনো স্বল্পমেয়াদি বিষয় নয়, বরং এটি কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নিতে পারে। যেসব দেশ মার্কিন বাহিনীকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে, ইরান তাদের সমানুপাতিক পাল্টা আঘাতের হুশিয়ারি দিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোর পানি শোধনাগার এবং বিমানঘাঁটিতে ইতিমধ্যে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এমনকি সৌদি আরবের তেল শোধনাগার সমৃদ্ধ ইয়ানবু অঞ্চলেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতদিনের চেনা কৌশলগত সীমাগুলো ভেঙে পড়ায় প্রতিটি নতুন হামলাই মধ্যপ্রাচ্যকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।