ছোট হয়ে আসছে চলনবিল

উত্তরাঞ্চলের প্রাণ ও দেশের বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত চলনবিল ক্রমেই হারাচ্ছে তার বিস্তৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণ, নদী-খালে পলি জমে নাব্য হ্রাস, জলপ্রবাহে বাধা এবং নির্বিচারে পুকুর খননের মতো মানবসৃষ্ট নানা কারণে বিলটির স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার করে কমছে চলনবিলের আয়তন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশীয় মাছের প্রজনন, জলজ জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং বিলনির্ভর লাখো মানুষের জীবিকার ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে চলনবিল ভবিষ্যতে আরও বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে এ চলনবিল। একসময় চলনবিলের আয়তন ছিল ১ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। বর্তমানে বর্ষাকালে এর জলমগ্ন এলাকা প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। তবে শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।

নাটোর বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। পলি জমে ভরাট এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদীই তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদ-নদী, খালে মাছ শিকারের সঙ্গে ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের কারণে দিনে দিনে বিলুপ্তের মুখে এসব দেশীয় মাছ। ফলে এ পেশা ছেড়ে অনেক জেলে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বড় বাধা পড়ে চলনবিলের ওপর।

১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি সøুইচগেট নির্মাণ হয়েছে। চলন বিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় হাইটেক পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমিতে জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্যক উঁচু ঢালাই রাস্তা। অন্যদিকে, পুকুর খনন করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে বিস্তীর্ণ চলনবিলে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। ফলে পানির গতিপথ নষ্ট হয়েছে। কমছে বিলের আয়তন।

বিভিন্ন গবেষকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, তখনই চলনবিলের সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, গঠিত হওয়ার সময় চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এর আয়তন অনেক কমে এসেছে।

ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়ার হিসেব মতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৪০ সালের এক জরিপে চলনবিলের আয়তন দাঁড়ায় ৭০৫ বর্গ কিলোমিটারে। বর্তমানে চলনবিলের আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারে। প্রতিবছর গড়ে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার আয়তন কমছে চলনবিলের।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে বড়াল নদ। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। কৃষকরা এসব খাল ও নালা থেকে ফসল উৎপাদনে সেচের পানি পেতেন।

সিংড়া পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সভাপতি এমরান আলী রানা জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্য হ্রাস চলনবিলের আয়তন দিনে দিনে কমছে। অন্যদিকে অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে কমছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। সরকারের উচিত, চলনবিলকে রক্ষা করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা। তা না হলে একসময় চলনবিল হারাবে তার জৌলুস।

নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমার মূল কারণই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রভাব বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি। তিনি আরও বলেন, ‘চলনবিলের ভেতরে অসংখ্য খাল রয়েছে, সেই খালগুলোর নাব্য  ফেরাতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণে দৃষ্টি দিতে হবে, তাহলে আমাদের এই বিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।’