পটুয়াখালী হাসপাতালে এক বিছানায় একাধিক রোগী, মেঝেতেও চিকিৎসা 

পটুয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন প্রতিটি শয্যা যেন একটি ছোট ওয়ার্ড। ৪০ শয্যার এই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ১৭৬ শিশু। ফলে কোথাও একই বিছানায় দুই, তিন, এমনকি চারজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। যাদের জন্য বিছানাও মেলেনি, তাদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। বিছানার চারপাশে স্বজনদের ভিড়, কোলে অসুস্থ শিশু, কোথাও আবার স্যালাইন ঝুলছে শুয়ে থাকা রোগীর পাশে। প্রতিদিনই এই ওয়ার্ডে শিশুদের চাপ বাড়ছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, মৌসুমি আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের সংক্রমণ ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। 

সদর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের পূর্ব হকতুল্লাহ গ্রামের মরিয়ম বেগম (২৩) তিন বছর ছয় মাস বয়সী মেয়ে জান্নাতুলকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে আক্রান্ত মেয়ের চিকিৎসার পাশাপাশি কোলে রয়েছে আট মাস বয়সী আরেক কন্যাশিশু ইয়ানুর।

মরিয়ম বলেন, ‘মেয়েটার শ্বাসকষ্ট খুব বেড়ে গিয়েছিল। ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে এনেছি। কিন্তু এখানে এত রোগী যে, একটি বিছানায় তিনজন শিশুকে রাখা হয়েছে। ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’

একইভাবে কালিকাপুর ইউনিয়নের বহালগাছিয়া এলাকা থেকে এক বছর সাত মাস বয়সী শাহিদাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার স্বজনরা। শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুটির চিকিৎসা চলছে অন্য শিশুদের সঙ্গে একই শয্যায়।

জৈনকাঠি ইউনিয়নের সেহাকাঠি গ্রামের শাহীন বয়াতি (২৭) ও শান্তা আক্তার (২০) তাদের দুই মাস বয়সী একমাত্র ছেলে জিসানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে। ওয়ার্ডের ১০ নম্বর শয্যায় আরও দুই শিশুর সঙ্গে চলছে জিসানের চিকিৎসা।

এদিকে রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই শিশু ওয়ার্ডের অধিকাংশ রোগীই হাসপাতাল থেকে খাবার পাচ্ছে না। দুর-দুরান্তের রোগীদের অনেকেই বাহির  থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। এতে করে তাদের অতিরিক্ত টাকাও ব্যয় হচ্ছে। 

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, ৪০ শয্যার এই শিশু ওয়ার্ডে ৪০ জন রোগীর জন্য খাবার বরাদ্দ রয়েছে। এ কারণে ভর্তিকৃত সকল রোগীদের খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।   

পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. অহিদুজ্জামান শামীম বলেন, শিশু ওয়ার্ডে শয্যার তুলনায় প্রায় চার গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে।

তার ভাষায়,‘একটি শয্যায় দুই থেকে তিনজন, কোথাও তারও বেশি শিশু রয়েছে। এতে শিশুরা যেমন স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারছে না, তেমনি তাদের মায়েরাও বসার জায়গা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে রোগী ও স্বজনদের সন্তুষ্ট করা কঠিন। তারপরও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
 
তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, শয্যা ও জনবল বাড়ানো না হলে এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। আর সেই চাপের সবচেয়ে বড় বোঝা বইতে হবে অসুস্থ শিশু ও তাদের পরিবারকে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমীন লিজা বলেন, পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় শুধু জেলার নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অভিভাবকেরা শিশুদের নিয়ে আসেন।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের সংক্রমণ এবং অপুষ্টিজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। অতিরিক্ত রোগীর কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’