২৩ জুলাই দেশ রূপান্তরের প্রচ্ছদে ‘ক্যাশলেস অর্থনীতির নতুন দিগন্ত’ শিরোনামযুক্ত প্রধান প্রতিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ অন্যান্য ব্যাংকের ঊর্ধ্বতনদের যে ভাষ্য উপস্থাপিত হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার নব অধ্যায়ের দিক নির্দেশ করছে। আমরা জানি, ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলা কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোড বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই এক কোডেই যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইলে আর্থিক সেবার (এমএফএস) গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করার ব্যবস্থা রয়েছে। বিক্রেতারাও এক কোড ব্যবহার করে ভোক্তার কাছ থেকে পণ্য ও সেবার বিনিময় মূল্য গ্রহণ করতে পারছেন। অর্থাৎ বিকাশ বা রকেটের দেওয়া বাংলা কিউআর কোডেও যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক ব্যবস্থায় সহজ হয়েছে ডিজিটাল লেনদেন। আমরা দেশে নতুন আর্থিক ব্যবস্থা সূচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে অভিনন্দন জানাই এবং একই সঙ্গে এক্ষেত্রে সব ব্যাংকের আরও পরিকল্পিত ও সমন্বিত ব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ করি।
অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশে^ ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর ক্রমেই নির্ভরতা বাড়ছে এবং এর জন্য যে জনআগ্রহ রয়েছে এরও যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। তবে এ জন্য সবার আগে দরকার সেবার মান নিশ্চিত করা, নিরাপত্তায় অধিকতর জোর দেওয়া এবং সেবা গ্রহীতাদের যেকোনো অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। বর্তমান জমানায় প্রযুক্তির বিকাশে অনেক কিছুই সহজসাধ্য হয়ে গেছে এবং উত্তরোত্তর প্রযুক্তিনির্ভরতার পরিসরও বাড়ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান, এও সত্য। আস্থা-নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো দেশ রূপান্তরে বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতনদের ভাষ্যেও নানাভাবে উঠে এসেছে। আমরা আশা করি, বাংলা কিউআর নামক লেনদেনের অনুষঙ্গ এই নতুন আর্থিক ব্যবস্থা আস্থা-বিশ^াসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, এ ব্যাপারে সরকারের নীতিমালা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা-জবাবদিহি একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহকসেবার ওপর নির্ভর করবে এর সাফল্য ও ভবিষ্যৎ।
বাংলা কিউআর দেশে প্রযুক্তিনির্ভর কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থার যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, এর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব পালনে সজাগ-সতর্কতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য। একটি অভিন্ন কিউআর কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়া আমাদের প্রেক্ষাপটে কম কথা নয়। নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথের পথিক অর্থাৎ এর অংশীজনের হার যত ঊর্ধ্বমুখী হবে এর অর্থনৈতিক ঔজ্জ্বল্যও ততই দৃশ্যমান হবে। এর বহুমুখী প্রভাব অর্থনীতির বিকাশের পথ সুগম করবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দুষ্টচক্রের ছায়া যাতে এর ওপর না পড়ে। এ জন্য আগাম ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ভুয়া কিউআর কোড ও প্রতারণার ফাঁদ পাততে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সুযোগ না নিতে পারে তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবার মানও উন্নত করতে হবে। সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে এই বিষয়গুলোয় সমগুরুত্বে নজর গভীর করা চাই। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দিতে সব স্তরের ব্যবসায়ীর জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা কিংবা কর ছাড়ের মতো সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলোও আমলে নেওয়া যেতে পারে। এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং তদারকির জন্য নীতিমালাও জরুরি এবং তা সেবা গ্রহীতাদের অবগত করার ব্যবস্থা রাখাও প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করতে ডিজিটাল লেনদেনের পরিসর বাড়াতে মনোযোগ গভীর করা দরকার। তা গ্রাহক ও প্রাপক উভয়ের জন্য হতে পারে স্বস্তির বিষয়। তাতে সরকারেরও রাজস্ব আয় বাড়বে। আমরা আরও মনে করি, বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রযুক্তির সার্থকতা নির্ভর করে এর যথাযথ প্রয়োগ বা ব্যবহারের ওপর। মানুষের বিশ^াস অভিঘাতগ্রস্ত হয় নানা কারণে, নানাভাবে এই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। আমরা মনে করি, সুদৃঢ় নীতিমালা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-কার্যকর-কঠোর তদারকি ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং সর্বস্তরের মানুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আস্থা অর্জন সম্ভব। নিরাপদ ও আস্থাশীল ডিজিটাল বাংলাদেশের আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমরা প্রত্যাশা করি।