যাদবপুরের প্রশ্নে মনে জাগা প্রশ্ন

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৪ এএম

সম্প্রতি ভারতের যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাউর হয়েছে। ৫০ নম্বরের এই লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে আমাদের দেশের শিক্ষক ও সচেতন মহলে যথেষ্ট চাঞ্চল্য ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সৃজনশীলতার প্রশ্ন কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে সারাদেশের শিক্ষক মহলে। পার্থক্য বোঝার খাতিরে এই প্রশ্নটির পাশাপাশি আমাদের দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন স্টাডি করলে স্বভাবত প্রশ্ন জাগবে বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন হওয়া উচিত? এর উত্তরও অজানা নয়। এটা ঠিক যে, বিশ^বিদ্যালয় জগতে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কেবল মুখস্থবিদ্যা যাচাই নয়; বরং উচিত একজন শিক্ষার্থী বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার জন্য কতটা প্রস্তুত তা যাচাইয়ের মাপকাঠিতে প্রশ্নের ধরন হওয়া। শিক্ষার্থী তার চিন্তাশক্তি ও যুক্তির মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর জ্ঞানের বাইরে তার নিজস্ব চিন্তা আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করতে পারেন তা অবশ্যই টারশিয়ারি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে ঠিক এ বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে। যেকোনো ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হলে সেই ভাষার ব্যাকরণের পাশাপাশি সাহিত্যে সম্যক জ্ঞান থাকতে হয়। কারণ ব্যাকরণ যেমন ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখে, ঠিক তেমনি সাহিত্য সেই ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির সঙ্গে রসের সংযোগ ঘটায়।

যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের প্রতিটি বিষয় নিয়ে ভাবলে একটি ধারণা স্পষ্ট হয়ে আসে। কোনোভাবেই পরীক্ষার্থীর মুখস্থবিদ্যার ওপর ছিটেফোঁটাও প্রাধান্য দেওয়া হয়নি, প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পরীক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মতামত, বোধশক্তি, সাহিত্যজ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ভাষা দক্ষতা এবং সর্বোপরি কল্পনাশক্তির ওপর। বাজারের গতানুগতিক নোট বই বা গাইড বই এক্ষেত্রে অকার্যকর ঠেকেছে। পরীক্ষার কক্ষে প্রশ্ন কমন ফেলানোর উদ্দেশে করা কোচিংনির্ভর গতানুগতিক বিষয়বস্তু এখানে কোনোরকম প্রভাব ফেলতে পারেনি। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মূলত মুখস্থভিত্তিক তথ্যনির্ভর জ্ঞান যাচাই করার কাজটি করা হয়। পাতা ভরে তথ্যভিত্তিক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে সঠিক উত্তরের বৃত্তটি ভরাট করতে বলা হয়। ফলে এ ধরনের পরীক্ষায় মৌলিক চিন্তা বা সৃজনশীলতার চেয়ে মুখস্থবিদ্যার দৌড় প্রাধান্য পায়। ভাষার প্রায়োগিক দিক এখানে থাকে উপেক্ষিত। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী সন্ধি-বিচ্ছেদ, কারক-বিভক্তি বা সমাসের মতো বিষয়গুলো একাধিক ক্লাসে অনেকবার পড়ে পরীক্ষায় পাস করে এসেছে। কিন্তু লিখতে বসলেই সৃজনশীল চিন্তার অভাবে তাদের কলমে অচলতা নেমে আসছে। স্নাতক পাস করেও শুদ্ধ করে দুয়েকটি বাক্য লিখতে এদের অনেকেরই বেগ পেতে হচ্ছে। অপরদিকে বহুনির্বাচনী পদ্ধতির পরীক্ষার কারণে এখানে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব ভাষায় অথবা বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে ভাব প্রকাশ বা যুক্তি প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। সংগতকারণেই এ প্রক্রিয়ায় সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বা যোগাযোগ দক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

উচ্চ গ্রেডের সনদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দিলেও তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে চাকরির পরীক্ষায়।

বিশ^ায়নের যুগে তাল মেলাতে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কয়েক বছর আগে অন্যরকম এক কাজ করা শুরু করেছে। তারা আউটকাম বেসড  সিলেবাস প্রণয়নের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাগিদ দিচ্ছে, প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। ১৯৫৬ সালে বেঞ্জামিন ব্লোম  প্রণীত ব্লোম’স   ট্যাক্সনমিতে শিক্ষার্থীদের শেখার লক্ষ্যে তাদের চিন্তাশক্তি স্তরের বিভিন্ন কাঠামোর কথা রয়েছে। কাঠামোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউজিসি যদি শিক্ষায় সৃজনশীলতার প্রায়োগিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে ভর্তির ক্ষেত্রে তারা এই বিষয়টা নিয়ে কেন মাথা ঘামাচ্ছে না? এ কথা সত্য যে, দেশে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় এতবেশি প্রার্থীর সমাগম ঘটে যে শুধু লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে খাতা মূল্যায়নে গেলে হয়তো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তবে মানের স্বার্থে এমসিকিউর পাশাপাশি ছোট অংশে হলেও লিখিত পরীক্ষা রাখা যেতে পারে যা আমাদের দেশের বুয়েট ও বাইরের অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজসহ ভালো ভালো বিশ^বিদ্যালয়গুলো অনুসরণ করছে। আমাদের দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলো আজকাল গবেষক বা বিজ্ঞানী বানানোর লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। এই সরে আসার কাজটি কিন্তু বিশ^বিদ্যালয় নিজ থেকে করেনি বা করার হুকুম দেয়নি। অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে পরিকল্পনামাফিক ভিন্ন খাতের রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।

গবেষক বা বিজ্ঞানীর কদর এ সমাজ কতটুকু দিতে জানে? কেনই বা দেবে? তাদের কলমের বল বা বাহুবল কোনোটার ধার ধারে না সমাজ। ফলে ক্ষমতার পদ-পদবি লাভের প্রতিযোগিতার আসর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি-নির্ভর বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ব্রিটিশ শিক্ষাচিন্তক ও লেখক জন হেনরি নিউম্যান তার বিখ্যাত ‘দ্য আইডিয়া  অব  এ  ইউনিভার্সিটি’ গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক ধারণা তুলে ধরেছেন। তার মতে, বিশ^বিদ্যালয় শুধু চাকরির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, যুক্তিবোধ ও উদার মানসিকতা গড়ে তোলার স্থান। জ্ঞান ও গবেষণাভিত্তিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সামনের সারিতে এনে দৃশ্যমান করতে চাইলে পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সিলেবাস প্রণয়ন, পঠন, পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এ কাজের বলয়ে আনতে হবে।

লেখক : ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত